দ্রব্যমূল্যের চাপে টিসিবিমুখী নিরুপায় মধ্যবিত্তরা
ছবি: সংগৃহীত
দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, ডিম, মাছ, মাংস ও সবজিসহ প্রায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যদিনের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছে। আয় বাড়েনি, কিন্তু প্রতিদিনের বাজার খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন মানুষ। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের চাকরিজীবী মধ্যবিত্তদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নীরব সংকট। সামাজিক মর্যাদার কারণে কারও কাছে সাহায্য চাইতেও পারছেন না, আবার বর্তমান বাজারদরে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেও পারছেন না অনেকে।
বাজার দরের এই উত্তাপ থেকে বাঁচতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর ট্রাকসেল। বাজারদরের তুলনায় কম মূল্যে তেল, ডাল ও চিনি পাওয়ার আশায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন শত শত মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।
তবে চাহিদার তুলনায় পণ্যের সরবরাহ অপ্রতুল হওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেককেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে টিসিবির ট্রাক ঘিরে তৈরি হওয়া দীর্ঘ লাইন এখন কেবল অভাবের চিত্র নয়, বরং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি।
রাজধানীর নিউমার্কেট, আসাদগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ট্রাকসেলের পণ্য বিক্রি শুরুর আগেই কয়েকশ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। নারী, বয়স্ক ব্যক্তি, দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বেসরকারি চাকরিজীবী সব শ্রেণির মানুষই এখন টিসিবির লাইনে। অনেকের হাতে বাজারের ব্যাগ, কেউ আবার অফিসে যাওয়ার আগে মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ছেন সামান্য কিছু টাকা সাশ্রয়ের আশায়।
নিউমার্কেট এলাকায় দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা গৃহিণী শান্তা আক্তার বলেন, আগে বাজার থেকে মাসের প্রয়োজনীয় জিনিস সহজে কেনা গেলেও এখন অর্ধেক জিনিস কিনতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। সংসারের খরচ সামলাতে বাধ্য হয়েই তিনি কম দামে তেল ও ডাল কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
একই এলাকার রিকশাচালক মো. বেলাল জানান, প্রতিদিনের আয়ের বড় অংশ এখন শুধু খাবারের পেছনেই চলে যাচ্ছে। বাজারে দুই লিটার তেল কিনতে যেখানে প্রায় ৪০০ টাকা এবং দুই কেজি মসুর ডাল কিনতে ২২০ থেকে ২৪০ টাকা লাগে, সেখানে টিসিবি থেকে একই পরিমাণ তেল ২৬০ টাকা ও ডাল ১৪০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
তার ভাষায়, টিসিবি না থাকলে পরিবার নিয়ে চলা আরও কঠিন হয়ে যেত।
আসাদগেট এলাকায় টিসিবির ট্রাকসেলের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রতন সরকার বলেন, আগে যে বেতনে স্বাচ্ছন্দ্যে মাস পার করা যেত, এখন সেই আয়ে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু টাকা বাঁচানোর জন্যই তাকে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েকজন চাকরিজীবী জানান, মধ্যবিত্তদের অবস্থা এখন সবচেয়ে বেশি সংকটপূর্ণ। নিম্ন আয়ের মানুষ বিভিন্ন সহায়তা পেলেও মধ্যবিত্তরা না পারছেন সাহায্য চাইতে, না পারছেন বাজারদর সামলাতে।
টিসিবির বিক্রেতারা বলছেন, আগে কখনো এত মানুষকে লাইনে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী এক ডিলার জানান, প্রতিদিন দুপুরের মধ্যেই সব পণ্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। চাহিদা এত বেশি যে ৪০০ জনের বেশি ক্রেতাকে পণ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে প্রত্যাশিত পণ্য না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে বিক্রেতারাও বিব্রত ও অসহায় বোধ করছেন। তাদের দাবি, এলাকাভিত্তিক চাহিদা বিবেচনায় পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে গত ১১ মে থেকে টিসিবি সাশ্রয়ী মূল্যে ট্রাকে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম শুরু করেছে, যা চলবে টানা ১০ দিন। বর্তমানে একজন ক্রেতা ট্রাকসেল থেকে এক কেজি চিনি, দুই কেজি মসুর ডাল ও দুই লিটার সয়াবিন তেল কিনতে পারছেন। এসব পণ্যের নির্ধারিত মূল্য হচ্ছে এক কেজি চিনি ৮০ টাকা, দুই কেজি মসুর ডাল ১৪০ টাকা এবং দুই লিটার সয়াবিন তেল ২৬০ টাকা। সব মিলিয়ে পুরো প্যাকেজ কিনতে খরচ হচ্ছে ৪৮০ টাকা। অথচ একই পরিমাণ পণ্য খোলা বাজার থেকে কিনতে প্রায় ৭৩০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
তবে অনেক ক্রেতার অভিযোগ, তারা শুধু তেল বা নির্দিষ্ট কোনো পণ্য কিনতে পারছেন না। একসঙ্গে পুরো প্যাকেজ কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে স্বল্প আয়ের অনেক মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের হাতে সীমিত টাকা থাকে, তারা প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও শুধু তেল কিনে ফিরতে পারছেন না।
এদিকে খোলা বাজারে সবজির দামও ক্রমাগত বাড়ছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বেশিরভাগ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সবজির দাম বাড়ায় ডিমের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ফার্মের লাল ডিম প্রতি ডজন ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর পাড়া-মহল্লার দোকানে এক হালি ডিম কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৫০ টাকা। মুরগির বাজারেও স্বস্তি নেই। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি জাতভেদে ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছ ও গরুর মাংসের বাজারও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে শুধু টিসিবির কার্যক্রম বাড়ালেই হবে না, একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করতে হবে।
তারা বলছেন, পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি, বাজারে তদারকির দুর্বলতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে। নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিয়মিত বাজার মনিটরিং জোরদারেরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের চাপ সামলাতে সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ এখন টিসিবির ট্রাকসেলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু সীমিত সরবরাহ ও বাড়তি চাহিদার কারণে সেই ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত স্বস্তি দিতে পারছে না। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সংকট দিন দিন আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের কাছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








