মঙ্গলবার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, দেশের প্রতিটি পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে আনা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দরিদ্র পরিবারকে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনি অঙ্গীকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হচ্ছে। আগামীকাল মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সকাল ১০টায় রাজধানীর বনানীস্থ টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তি সংলগ্ন) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই যুগান্তকারী প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন। একই সময়ে দেশের আরও ১৪টি স্থানে একযোগে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, উদ্বোধনের সময় রাজধানীর কড়াইল এলাকা ছাড়াও দেশের আরও ১৪টি স্থানে একযোগে এই কার্যক্রম চালু করা হবে। নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (০৯ মার্চ) সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন জানান, পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৩টি জেলার সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের মোট ১৫টি ওয়ার্ডে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। এ পর্যায়ে নির্বাচিত নারী প্রধান পরিবারগুলোকে মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তাও দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
মন্ত্রী জানান, প্রাথমিকভাবে ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারী প্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে যাচাই-বাছাই ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্ট (দারিদ্র্য সূচক) পদ্ধতিতে মূল্যায়ন শেষে চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৪টি পরিবারকে ভাতা দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
উপকারভোগী নির্বাচনের জন্য ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়। ওয়ার্ড কমিটির সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা, সদস্যসংখ্যা, শিক্ষা, বাসস্থান, গৃহস্থালি সামগ্রী, রেমিট্যান্স প্রবাহসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে তা যাচাই করা হয় এবং সফটওয়্যারের মাধ্যমে দারিদ্র্য সূচক নির্ধারণ করে পরিবারগুলোকে হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি নারী প্রধান পরিবার একটি আধুনিক স্মার্ট কার্ড পাবে। স্পর্শবিহীন চিপ, কিউআর কোড ও এনএফসি প্রযুক্তি সম্বলিত এই কার্ডে পরিবারের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে, যা নিরাপদ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য হবে। একটি কার্ডের মাধ্যমে একটি পরিবারের সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্য সুবিধা পাবে। যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হলে আনুপাতিক হারে একাধিক কার্ড দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
আরও পড়ুন: ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাবে না যে ৬ শ্রেণির মানুষ
এই কর্মসূচির আওতায় মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। সরকারি কোষাগার থেকে জি-টু-পি (গভর্নমেন্ট টু পারসন) পদ্ধতিতে অর্থ পাঠানো হবে, যাতে কোনো ধরনের মধ্যস্থতা বা বিলম্ব ছাড়াই উপকারভোগীরা ঘরে বসেই সহায়তা পান।
সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, কার্ডটি পরিবারের মা বা নারী প্রধান সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে। তবে নির্বাচিত নারী গৃহপ্রধান অন্য কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তা পেলে সেই সুবিধা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। যদিও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাদের প্রাপ্য ভাতা গ্রহণ অব্যাহত রাখতে পারবেন।
কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি শ্রেণির মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে এমন পরিবার, হিজড়া ও বেদে সম্প্রদায়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবার এবং সর্বোচ্চ দশমিক পাঁচ একর জমির মালিক পরিবার।
অন্যদিকে যেসব পরিবারের সদস্য সরকারি চাকরিজীবী বা পেনশনভোগী, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক লাইসেন্স রয়েছে, বিলাসবহুল সম্পদ যেমন গাড়ি বা এসি রয়েছে, অথবা পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে- সেসব পরিবার এই ভাতার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে না।
সরকার জানিয়েছে, বিদ্যমান টিসিবি কার্ডকে ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। একই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে ওটিপি যাচাইকরণের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সহায়তা নেওয়া যাবে। ভবিষ্যতে শিক্ষা উপবৃত্তি, কৃষি ভর্তুকি ও অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা সুবিধাও এই কার্ডের মাধ্যমে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাইলট প্রকল্প হিসেবে আগামী চার মাসে ধাপে ধাপে ৪০ হাজার পরিবারের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। চলতি মাসে প্রথম ধাপে ১০ হাজার পরিবার কার্ড পাবে। পরবর্তী তিন মাসে পর্যায়ক্রমে আরও ৩০ হাজার পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে।
সরকার জানিয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ অর্থ থেকেই এই কর্মসূচির ব্যয় নির্বাহ করা হবে। পাইলট পর্যায়ে জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য মোট ৩৮ দশমিক ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশ অর্থ সরাসরি নগদ সহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে এবং বাকি অর্থ তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন ডাটাবেজ তৈরি ও কার্ড প্রস্তুতসহ প্রশাসনিক কাজে ব্যয় হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে এই কর্মসূচি সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে এবং আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ২০৩০ সালের মধ্যে এই কার্ডকে একটি সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্রে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








