প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে আবারও উত্তাল ভারত
ছবি: সংগৃহীত
চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি এবং ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্য আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
সোমবার (১০ আগস্ট ২০২৬) ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচিতে নতুন বিধানসভা ভবন ঘেরাও বা বিধানসভা অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী রাঁচিতে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। বিক্ষোভ দমনে পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস এবং লাঠিচার্জ ব্যবহার করে, যার ফলে গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (জেপিএসসি) এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন (জেএসএসসি)-এর বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বারবার ফাঁস হওয়ার প্রতিবাদে গত প্রায় ১৬ দিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর সম্পূর্ণ বাতিলকরণ, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং গোটা কেলেঙ্কারির পেছনে থাকা চক্রকে ধরতে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই) বা বিচার বিভাগীয় তদন্ত।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে তারা শিক্ষার্থীদের দাবির প্রায় ৯৮ শতাংশ মেনে নিয়েছে এবং একাধিক বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে জেএসএসসি-সিজিএলসহ অন্যান্য পরীক্ষার ক্ষেত্রে সিবিআই তদন্তের দাবিতে শিক্ষার্থীরা তাদের অনড় অবস্থান বজায় রেখেছেন।
সোমবার সকালে ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রেন, বাস এবং ব্যক্তিগত যানবাহনে করে হাজার হাজার পরীক্ষার্থী রাঁচিতে এসে পৌঁছান। শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড ভেঙে নতুন বিধানসভার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তি বাঁধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রথমে জলকামান ও পরে মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ চালায়।
পুলিশের লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহারের মুখেও আন্দোলনকারীরা পিছু হটেনি; বরং জলের প্রবল ধারার সামনেই অনেক শিক্ষার্থীকে জাতীয় সংগীত গাইতে এবং প্রতীকী আনন্দে নাচতে দেখা যায়, যা বিগত বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনের দৃশ্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন এবং একজনের মাথায় আঘাত পাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে রাঁচির প্রধান সংযোগস্থলগুলোতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং শহরের অধিকাংশ স্কুল বন্ধ রাখা হয়। এমনকি রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ ঠেকাতে জেলার সীমান্ত ও মহাসড়কগুলোতে যান চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করে প্রশাসন।
আরও পড়ুন: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে আবার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি সিজিপির
আন্দোলনের তীব্রতার মুখে রবিবারই ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (জেপিএসসি) তিন সদস্য পদত্যাগ করেন। এর আগে গত ২২ জুলাই কমিশনের তৎকালীন চেয়ারপার্সন এল খিয়াংতে পদত্যাগ করেছিলেন। পরবর্তীতে নিয়োগ দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজ্য সিআইডি ঝাড়খণ্ডের সাবেক এই চেয়ারপার্সন এল খিয়াংতেকে গ্রেফতার করে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, বিগত কয়েক দিনের দফায় দফায় বৈঠকের পর সরকার ১৪তম জেপিএসসি প্রিলিমিনারি পরীক্ষা এবং ২০২৩ ও ২০২৫ সালের ব্যাকলগ নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে সিজিএল পরীক্ষার ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ ও আইনি জটিলতার কথা বলে সরকার একপক্ষীয়ভাবে তা বাতিল করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং এর পরিবর্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে মনিটরিং কমিটি গঠন ও প্রয়োজনে অর্থঝাঁপড় রোধে ইডি (জব্দদারি অধিদপ্তর) তদন্তের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সিবিআই তদন্তের দাবিতে অনড় থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
এই পুরো আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঝাড়খণ্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। অনশনরত ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র মাহাতো ও রবি পাসসহ অন্যান্য নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই দিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না করা পর্যন্ত এই লড়াই থামবে না। এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে অনশন ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা।
অন্যদিকে, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা বাবুলাল মারান্ডি বর্তমান হেমন্ত সোরেন সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে একে স্বৈরাচারী আচরণ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তার অভিযোগ, চাকরিপ্রার্থীদের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে সরকার বলপ্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে এবং বিরোধী বিধায়কদেরও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে বিজেপির পক্ষ থেকেও মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভ দেখানো হয়।
তবে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন এর আগে সংকট নিরসনে আলোচনার ওপর জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, লাঠি বা বলপ্রয়োগ নয়, কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি তরুণ সমাজকে কোনো রাজনৈতিক প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমানে পুরো রাঁচি জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং রাজ্য প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর রয়েছে সব মহলের।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








