নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:১৪, ১০ আগস্ট ২০২৬

চার সদস্যের দল নিয়ে ঢাকায় ‘র’ প্রধান

চার সদস্যের দল নিয়ে ঢাকায় ‘র’ প্রধান

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে, তার মধ্যেই সরকারি সফরে ঢাকায় এসেছেন ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং র-এর প্রধান পরাগ জৈন। 

চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে রবিবার (০৯ আগস্ট) দুপুরে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। 

বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণেই এই সফর বলে সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে সফরটি নিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বা ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা বা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পরাগ জৈনের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলে রয়েছেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবাল রায় চৌধুরী। সফরকালে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ঢাকার একটি হোটেলে অবস্থান করবেন। সফরের মেয়াদ, ঢাকায় কার কার সঙ্গে তাদের বৈঠক হওয়ার কথা কিংবা আলোচনার নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। ফলে গোয়েন্দা পর্যায়ের এই সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে আগ্রহ তৈরি হলেও এর আলোচ্যসূচি সম্পর্কে প্রকাশ্যে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।

পরাগ জৈন ভারতের নিরাপত্তা কাঠামোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন কর্মকর্তা। ১৯৮৯ ব্যাচের পাঞ্জাব ক্যাডারের ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের এই কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১ জুলাই ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা র-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি রবি সিনহার স্থলাভিষিক্ত হন এবং দুই বছরের মেয়াদে এই দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে পরাগ জৈন র-এর এভিয়েশন রিসার্চ সেন্টারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আকাশপথে নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ এই শাখার নেতৃত্ব দেওয়ার সময় তিনি ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত গোয়েন্দা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের অপারেশন সিঁদুর-এর সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়।

দীর্ঘ কর্মজীবনে পরাগ জৈনের দায়িত্বের পরিধি শুধু কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ ছিল না। পাঞ্জাবে সন্ত্রাসবাদ দমনের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান-সংক্রান্ত গোয়েন্দা কার্যক্রম, জম্মু-কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিদেশে ভারতের কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গেও তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও কানাডায় ভারতীয় মিশনেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। কানাডায় অবস্থানকালে খালিস্তানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা পর্যবেক্ষণেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

পরাগ জৈন বর্তমানে র-এর প্রধানের দায়িত্বের পাশাপাশি ভারতের স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপের (এসপিজি) স্পেশাল সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তার ঢাকা সফরকে শুধু নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয় হিসেবে দেখার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা পর্যায়ের যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অবশ্য এই সফরে তিনি এসপিজির দায়িত্ব-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে আলোচনা করবেন কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

আরও পড়ুন: ভারত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ইতিবাচক দিকে এগোবে বলে আশা করি

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক গতিপথের দিকে তাকালে পরাগ জৈনের ঢাকা সফরের তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা কমিয়ে আনতে উভয় পক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের মার্চে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশীদ চৌধুরীর নয়া দিল্লি সফর বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ওই সফরে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, সামরিক গোয়েন্দা মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এস রামান এবং র প্রধান পরাগ জৈনের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

ওই বৈঠকগুলোকে বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। 

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আলোচনায় দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা যোগাযোগের পথগুলো পুনরায় সক্রিয় করা এবং কোনো দেশের ভূখণ্ড যেন অন্য দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে সমঝোতার বিষয় উঠে এসেছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই সফরকে প্রকাশ্যে খুব বেশি প্রচার করা হয়নি এবং ভারতের পক্ষ থেকেও বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বিবরণ দেওয়া হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে কয়েক মাসের ব্যবধানে র প্রধানের ঢাকা সফরকে দুই দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা পর্যায়ের যোগাযোগের ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মার্চে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা প্রধানের নয়া দিল্লি সফরে পরাগ জৈনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের পর এবার একই পর্যায়ের একজন ভারতীয় কর্মকর্তা ঢাকায় আসায় পারস্পরিক যোগাযোগের পরিধি বাড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই সফরের সঙ্গে মার্চের বৈঠকের সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো কোনো সরকারি তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।

বাংলাদেশের নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে গোয়েন্দা পর্যায়ের যোগাযোগ স্বাভাবিক হওয়া বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মার্চে দুই দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের যোগাযোগকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছিল।

এদিকে, ঢাকায় আসার আগে পরাগ জৈন চীন সফর করেছেন বলেও সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে। তবে চীন সফরের সময় তিনি কার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, সফরের উদ্দেশ্য কী ছিল কিংবা সেই সফরের সঙ্গে ঢাকার বর্তমান সফরের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এ বিষয়ে প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই চীন সফরকে ঘিরে কোনো ধরনের অনুমাননির্ভর ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশে পরাগ জৈনের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর গোপনীয়তা। এত উচ্চপর্যায়ের একজন ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার সফর হলেও দুই দেশের কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের ঘোষণা দেয়নি। প্রতিনিধি দলের সদস্যদের পরিচয়, সফরের স্থান ও অবস্থানের বিষয়ে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা মূলত সংশ্লিষ্ট সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রনির্ভর। এ ধরনের সফরের ক্ষেত্রে আলোচনার বিষয় প্রকাশ্যে না আসা অস্বাভাবিক নয়; বিশেষ করে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ সাধারণত প্রকাশ্য কূটনৈতিক বৈঠকের মতো বিস্তারিতভাবে জানানো হয় না।

তবে বর্তমান সফরকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে ঢাকায় পরাগ জৈনের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল ঠিক কোন বিষয়ে আলোচনা করবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বলায় নিশ্চিত করে কোনো বিষয় উল্লেখ করা যাচ্ছে না। দুই দেশের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা যোগাযোগের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং দুই দেশের ভূখণ্ড একে অপরের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না করার মতো বিষয় আলোচনায় আসতে পারে তবে এগুলো সম্ভাব্য বিষয়, নিশ্চিত আলোচ্যসূচি নয়।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে নতুন করে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের সময়েই র প্রধানের ঢাকা সফর ঘটায় এর আলাদা গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা প্রধানের নয়া দিল্লি সফরে ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যে যোগাযোগের সূচনা হয়েছিল, পরাগ জৈনের ঢাকায় আসা সেই প্রক্রিয়াকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারে। তবে সফর শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি বা বৈঠকের তথ্য প্রকাশ করা হলে তবেই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য, আলোচনার বিষয় এবং সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়