নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:২৬, ১০ আগস্ট ২০২৬

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

ফাইল ছবি

দেশে হামের সংক্রমণ ও হামের উপসর্গজনিত মৃত্যু কমার লক্ষণ এখনও স্পষ্ট নয়। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৫৫ জন। 

সোমবার (১০ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৯২ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৬৩ জনের শরীরে। তবে এ সময়ে নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি। মারা যাওয়া পাঁচজনই হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিল। তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগের এবং দুজন সিলেট বিভাগের।

চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এই সময়ে দেশে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে মোট ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩১২ জনের। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৭ হাজার ২৭৮ জনের শরীরে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৩২২ জন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩৯ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৭৮০ শিশু। একই সময়ে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৮ জনের। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭৮। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৯ শতাংশই হয়েছে হামের উপসর্গজনিত হিসেবে, আর নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা মোট মৃত্যুর তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম। 

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাদুর্ভাবের সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাগুলোকেও হামের প্রকোপের সামগ্রিক মৃত্যুচিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করতে হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে রোগীদের বয়সভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় কোন বয়সসীমার শিশু সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বা কোন বয়সে মৃত্যুঝুঁকি বেশি তার সাম্প্রতিক জাতীয় চিত্র সরাসরি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও হাসপাতালভিত্তিক বিশ্লেষণে শিশুদের, বিশেষ করে কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি বেশি হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। 

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে ভর্তি রোগীদের ওপর আইসিডিডিআরবি ও হাসপাতালটির ১৯ জন গবেষকের করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসা নিতে আসা ৩৪১ শিশুর ৮০ শতাংশই হামের টিকা পায়নি। এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের নিয়ে ওই গবেষণা করা হয়।

গবেষণাটিতে টিকা না পাওয়ার কারণও বয়সভেদে আলাদা করে দেখা গেছে। গবেষণায় থাকা শিশুদের ৪৩ শতাংশের বয়স ছিল ছয় মাসের কম অর্থাৎ নিয়মিত সূচি অনুযায়ী হাম-রুবেলা টিকা নেওয়ার বয়সই তাদের হয়নি। আবার ৯ মাসের বেশি বয়সী ৩৭ শতাংশ শিশুও কোনো হাম-রুবেলা টিকা নেয়নি। মাত্র ১৪ শতাংশ শিশু একটি ডোজ এবং ৬ শতাংশ শিশু দুই ডোজ টিকা পেয়েছিল। ফলে সংক্রমণের এই বিস্তারের পেছনে শিশুদের একটি বড় অংশের টিকাবিহীন বা অসম্পূর্ণ টিকাদান অবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুধু আক্রান্ত শিশুদের মধ্যেই নয়, মৃত্যুর ঘটনাগুলোতেও টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। 

আরেকটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া ৩৩৭ শিশুর ৯১ শতাংশই কোনো হাম-রুবেলা টিকা পায়নি। তাদের মধ্যে ২২ শতাংশের বয়স ছিল ছয় মাসের নিচে, ৩০ শতাংশের বয়স ছয় থেকে নয় মাস, ২৫ শতাংশের বয়স নয় থেকে ১১ মাস এবং ১৭ শতাংশের বয়স এক থেকে চার বছর। অর্থাৎ এক বছরের কম বয়সী শিশুরাই ওই মৃত্যুর ঘটনাগুলোর বড় অংশজুড়ে ছিল।

আরও পড়ুন: হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ শিশুর মৃত্যু

এ ছাড়া সাম্প্রতিক আরেকটি বিশ্লেষণে হামে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৫২ শতাংশের বয়স নয় মাসের কম পাওয়া গেছে। এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছানোর আগের শিশুদেরও সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বিশেষ জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ প্রয়োজন। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকলে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

টিকাদানের ঘাটতির চিত্রটি জাতীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের শুরুতে হাম-রুবেলা টিকাদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন এলাকায় অসম্পূর্ণ কভারেজ ও টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। 

ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভির এক যৌথ প্রতিবেদনে এর আগেই বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি থাকলেও প্রায় পাঁচ লাখ শিশু সব টিকার পূর্ণ ডোজ সময়মতো পাচ্ছিল না। বিশেষ করে শহরের বস্তি ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে টিকাদানের ঘাটতি তুলনামূলক বেশি ছিল।

হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেয়। 

মে মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ৯ মে পর্যন্ত ১ কোটি ৭২ লাখ ৬৮ হাজার ৯০৮ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল, যা তখনকার হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৬ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক হিসাবে তখন সবচেয়ে বেশি শিশু টিকা পেয়েছিল ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।

বর্তমানে সরকার দাবি করছে, হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি সাফল্য এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে ২ কোটি ১২ লাখ তিন হাজার ৩৯৮ জনকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। 

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী করা হয়েছে এবং আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে। 

তবে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ধারাবাহিকতা বলছে, টিকা দেওয়ার পরিসর বাড়লেও ঝুঁকিপূর্ণ ও বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের শনাক্ত করে তাদের সুরক্ষার আওতায় আনা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

হাম প্রতিরোধে টিকাদানের গুরুত্ব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও একই দিকে ইঙ্গিত করছে। কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় জনসংখ্যার একটি বড় অংশের মধ্যে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হলে টিকাদানের সামগ্রিক হার ভালো থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে সংক্রমণের বড় বিস্তার ঘটতে পারে। ২০২৬ সালের প্রাদুর্ভাব নিয়ে প্রকাশিত একটি পরিস্থিতি বিশ্লেষণেও টিকাদানের অসমতা, বাদ পড়ে যাওয়া শিশু এবং বিভিন্ন এলাকায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিকে সংক্রমণ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

হামের চিকিৎসায় মূল চ্যালেঞ্জ শুধু ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সংক্রমণের পর তৈরি হওয়া জটিলতা মোকাবিলা করা। শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা, অপুষ্টি ও অন্যান্য সংক্রমণ পরিস্থিতিকে গুরুতর করে তুলতে পারে। ফলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত শয্যা, অক্সিজেন, শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নিবিড় পরিচর্যা এবং দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

চলমান প্রাদুর্ভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নিশ্চিত হামের সংখ্যা এবং হামের উপসর্গের সংখ্যা এক নয়। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৬৩ জনের, বিপরীতে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় এসেছে ৯৯২ জন। ১৫ মার্চ থেকে মোট নিশ্চিত রোগী ১৭ হাজার ২৭৮ হলেও একই সময়ে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩১২। ফলে শুধু পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণ ব্যাপ্তি বোঝা সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান আরও বলছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও তাদের বড় অংশ চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। মোট ১ লাখ ১৯ হাজার ৩২২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিপরীতে ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩৯ জন ছাড়পত্র পেয়েছে। এর অর্থ, আক্রান্তদের বড় অংশ চিকিৎসায় সাড়া দিলেও দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতাল ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ বজায় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে শুধু একটি টিকাদান অভিযান যথেষ্ট নয়; নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি পূরণ, বাদ পড়ে যাওয়া শিশু শনাক্তকরণ, প্রত্যন্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় টিকাদানের সুযোগ বাড়ানো, রোগ নজরদারি জোরদার এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা সবগুলো পদক্ষেপ একসঙ্গে চালিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে টিকাদানের বয়সের আগের শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

এদিকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাপক অগ্রগতি দাবি করা হলেও হাম ও হামের উপসর্গজনিত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা এখনও উদ্বেগজনকভাবে বড়। ১৫ মার্চ থেকে ১০ আগস্ট প্রায় পাঁচ মাসের ব্যবধানে ১ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে হামের উপসর্গ এবং ১৭ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হওয়া পরিস্থিতিটির ব্যাপকতা স্পষ্ট করে। একই সময়ে ৮৭৮ জনের মৃত্যু, যার মধ্যে ৭৮০ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে, প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় টিকাদানের পাশাপাশি রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়