প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে আবার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি সিজিপির
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত তরুণদের আন্দোলনের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আবারও দেশজুড়ে বিক্ষোভে ফেরার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, আন্দোলন প্রত্যাহারের বিনিময়ে কেন্দ্রীয় সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি বা পুলিশি ব্যবস্থা না নেওয়া এবং দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার বাস্তবায়ন করা হয়নি। বরং বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থী, আন্দোলনকারী ও স্বেচ্ছাসেবকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার, নজরদারি এবং হয়রানি অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) থেকে নতুন করে কঠোর আন্দোলন শুরু করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি, রয়টার্স, টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং অন্যান্য গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার পর দিল্লির যন্তর মন্তরে ৩৭ দিনের টানা অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করেছিল সিজেপি।
সংগঠনটির ভাষ্য ছিল, সরকারের দেওয়া আশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখিয়েই তারা আন্দোলন সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করেছে। তবে সেই সমঝোতার মাত্র দুই দিনের মাথায় বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত থাকায় সরকার কার্যত চুক্তিভঙ্গ করেছে বলে অভিযোগ তুলেছে তারা।
সিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পুলিশি ব্যবস্থা না নেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল, সেটি এখন প্রকাশ্যেই লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
তার দাবি, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, দিল্লিসহ বিভিন্ন রাজ্যে শত শত শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অনেককে নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবকদেরও আটক করা হচ্ছে। এসব ঘটনা শুধু সমঝোতার পরিপন্থী নয়, বরং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকারকেও ক্ষুণ্ন করছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংকে ট্যাগ করে দেওয়া ওই পোস্টে আশুতোষ রাঙ্কা সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব এফআইআর অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে, আটক শিক্ষার্থীদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে দিল্লি পুলিশ, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা কিংবা বিজেপি বা এনডিএ-শাসিত রাজ্যগুলোর পুলিশ যেন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা না করে, সে বিষয়ে লিখিত নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে আলোচনার সময় মামলা প্রত্যাহারসংক্রান্ত যে লিখিত চুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটিও মঙ্গলবারের মধ্যে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। অন্যথায় আন্দোলনে ফেরার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে বলে সতর্ক করেছেন সিজেপির এই নেতা।
আরও পড়ুন: তেলাপোকাদের আন্দোলনের পর পরীক্ষা সংস্কারে মোদির নতুন ঘোষণা
গত শনিবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তৃতীয় দফার বৈঠকের পর সিজেপি ঘোষণা দিয়েছিল যে, তাদের বেশ কয়েকটি দাবি নীতিগতভাবে মেনে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছিল নিট (NEET) পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের জেরে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার আশ্বাস। একই সঙ্গে শিক্ষা সংস্কার নিয়ে সিজেপির পাঁচ দফা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখারও সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
বর্তমান আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা NEET-এর প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা বাতিল, নিয়োগে অনিয়ম, যুব বেকারত্ব এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে। পরে এই আন্দোলন শুধু পরীক্ষা-সংক্রান্ত সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষা সংস্কার, সরকারি জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থার দাবিতে দেশব্যাপী এক বৃহৎ তরুণ আন্দোলনে রূপ নেয়। ব্যঙ্গাত্মকভাবে ককরোচ জনতা পার্টি নাম গ্রহণ করা এই সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা অভিজিৎ দীপকের আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেন। প্রযুক্তিবিদ নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে গঠিত ওই টাস্কফোর্সকে পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশ্নফাঁস রোধ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার সুপারিশ তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংসদে পরীক্ষা জালিয়াতি ও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইন সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২০ জুলাইয়ের চলো সংসদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ এবং ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। দিল্লি পুলিশ দাবি করেছিল, আন্দোলনকারীরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সংসদের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। ওই ঘটনার পর দেশজুড়ে একাধিক মামলা দায়ের হয়, যা প্রত্যাহারকে শুরু থেকেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছিল সিজেপি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুব আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও এখন এটি কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের বৃহত্তর প্রতীকে রূপ নিয়েছে। আন্দোলনটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের ওপর উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে এবং বিরোধী দলগুলোকেও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে সিজেপি শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, তাদের আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে নয়; এটি সম্পূর্ণ শিক্ষার্থী ও তরুণদের অধিকারভিত্তিক গণআন্দোলন।
এদিকে সিজেপির সর্বশেষ অভিযোগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো জানানো হয়নি। ফলে মঙ্গলবার থেকে সংগঠনটি সত্যিই নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে কি না এবং সরকার তাদের দাবির বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর রয়েছে ভারতের রাজনৈতিক মহল ও শিক্ষার্থী সমাজের।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








