দুবাই উপকূলে কুয়েতের তেল ট্যাঙ্কারে ইরানের হামলা
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও ভয়াবহ ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই উপকূলের কাছে কুয়েতের পতাকাবাহী পূর্ণবোঝাই অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘আল-সালমি’তে ড্রোন হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করেছে।
সোমবার (৩০ মার্চ) দিবাগত রাতে দুবাই উপকূলের কাছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমায় নোঙর করা ‘আল-সালমি’ নামক একটি বিশালাকৃতির কুয়েতি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।
২ মিলিয়ন (২০ লক্ষ) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বোঝাই জাহাজটিতে হামলার পর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ অবিলম্বে উন্মুক্ত না করলে ইরানের সমস্ত জ্বালানি কেন্দ্র ও তেলকূপ গুঁড়িয়ে দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (কেপিসি) জানিয়েছে, ট্যাঙ্কারটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল, যার বাজারমূল্য ২০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। হামলার ফলে জাহাজে আগুন ধরে যায় এবং কাঠামোগত ক্ষতি হয়। প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা করা হয়, সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে দুবাই কর্তৃপক্ষের দ্রুত তৎপরতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। জাহাজে থাকা ২৪ জন ক্রু সদস্যের সবাই নিরাপদ রয়েছেন এবং কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ঘটনাটি এমন সময় ঘটল, যখন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে পুরো অঞ্চলজুড়ে টানা এক মাস ধরে সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই ‘আল-সালমি’তে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ঘটনার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমস্ত জ্বালানি অবকাঠামো তেলকূপ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, খারিগ দ্বীপ এবং পানি শোধনাগার ধ্বংস করে দেবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় ট্রাম্প আরও বলেন, দ্রুত কোনো চুক্তি না হলে সামরিক পদক্ষেপের পথও খোলা থাকবে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগামী ৬ এপ্রিলের মধ্যে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চান। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে।
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের হাজার হাজার সৈন্য মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, সংঘাতের বিস্তারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন বিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধ করল স্পেন
তুরস্ক জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করলে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তা ধ্বংস করা হয়। একই সময়ে ইসরায়েল তেহরান ও বৈরুতে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যেখানে লেবাননের দক্ষিণে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর তিন সদস্য নিহত হয়েছেন।
সৌদি আরবও হামলার মুখে পড়েছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ১০টির বেশি ড্রোন ও নয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রিয়াদ। একই সঙ্গে প্রিন্স সুলতান ঘাঁটি এবং রাজধানী রিয়াদ এলাকাও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তান, মিশর, সৌদি আরব এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যস্থতায় একটি শান্তি প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছেছে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই প্রস্তাবটিকে ‘অযৌক্তিক ও অবাস্তব’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তার দাবি, ইরান বর্তমানে আগ্রাসনের শিকার এবং তারা আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে যায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ১০৯ থেকে ১১৫ ডলার পর্যন্ত উঠেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১০৬ ডলার ছাড়িয়েছে। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার অতিক্রম করেছে। মার্চ মাসে ব্রেন্ট তেলের দাম প্রায় ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা নজিরবিহীন।
তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক ৪ শতাংশের বেশি এবং জাপানের নিক্কেই সূচক ২ দশমিক ২৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, যদিও পরে কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়। যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব স্পষ্ট গ্যাসোলিনের খুচরা মূল্য তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলার তহবিল চেয়েছে এবং আরব দেশগুলোকেও ব্যয় ভাগাভাগির আহ্বান জানানোর পরিকল্পনা করছে।
এদিকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অবনতির দিকে। সৌদি আরবের রাস তানুরা উপকূলের কাছে একটি গ্রিক মালিকানাধীন জাহাজের আশেপাশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে।
একইভাবে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটলেও এসবের দায় এখনো কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।
সব মিলিয়ে, দুবাই উপকূলে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন আক্রমণ নয়; বরং এটি চলমান বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতেরই অংশ, যা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








