থাইল্যান্ডে স্কুলে বন্দুক হামলা, নিহত ৮
ছবি: সংগৃহীত
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের উত্তর-পশ্চিম উপকণ্ঠের ননথাবুরি প্রদেশে এক কিশোর শিক্ষার্থীর ভয়াবহ বন্দুক হামলায় দাদা-দাদিসহ অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে হামলাকারী নিজেও রয়েছে। এছাড়া অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন, যাদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হামলাকারী প্রথমে নিজ বাড়িতে দাদা-দাদিকে গুলি করে হত্যা করে, পরে একই অস্ত্র নিয়ে নিজের স্কুলে প্রবেশ করে শিক্ষক ও সহপাঠীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। ঘটনাটি থাইল্যান্ডজুড়ে তীব্র শোক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং দেশটির স্কুল নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শুক্রবার (০৭ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ১০টার দিকে ননথাবুরি প্রদেশের ব্যাং ক্রুয়াই জেলার স্বনামধন্য ডেবসিরিন ননথাবুরি স্কুলে এই হামলার ঘটনা ঘটে।
থাই পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারী ১৪ বছর বয়সী (কিছু স্থানীয় প্রতিবেদনে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে) ওই স্কুলেরই একজন শিক্ষার্থী। হামলায় স্কুলের তিন শিক্ষক ও তিন শিক্ষার্থী নিহত হন। এর আগে নিজ বাড়িতে সে তার দাদা ও দাদিকেও গুলি করে হত্যা করে। পরে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। ফলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় আটজনে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, হামলায় ব্যবহৃত ৯ মিলিমিটার পিস্তলটি তার দাদার ছিল। ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ২৬ রাউন্ড গুলি ছোড়ার আলামত এবং অতিরিক্ত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। কীভাবে একজন কিশোর পরিবারের অস্ত্র নিয়ে এমন হামলা চালাতে সক্ষম হলো, তা তদন্তের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
হামলার সময় স্কুলজুড়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দ্রুত শ্রেণিকক্ষের ভেতরে আশ্রয় নিতে বলেন। কেউ দরজা-জানালা বন্ধ করে মেঝেতে শুয়ে পড়ে, আবার কেউ নিরাপদ পথ পেয়ে ভবন থেকে বেরিয়ে আসে। বিশেষ পুলিশ ইউনিট, জরুরি উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসা দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে এবং কয়েক ঘণ্টার অভিযানের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে এলাকা এড়িয়ে চলতে এবং সামাজিক মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার না করার অনুরোধ জানানো হয়, যাতে উদ্ধার ও নিরাপত্তা অভিযানে বিঘ্ন না ঘটে।
১৮ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী রয়টার্সকে জানান, প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন বাইরে কেউ হয়তো আতশবাজি ফাটাচ্ছে অথবা কোনো ধাতব বস্তুতে আঘাত করছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই একের পর এক গুলির শব্দ শুনে সবাই বুঝতে পারেন ভয়াবহ কিছু ঘটছে।
তিনি বলেন, প্রথমে বুঝতেই পারিনি এটা গুলির শব্দ। তারপর টানা অনেকগুলো গুলি চলল। কিছুক্ষণ নীরবতা ছিল, এরপর আবার গুলি শুরু হয়।
এক প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসিকে জানান, তিনি নিজের চোখে হামলাকারীকে একজন শিক্ষককে গুলি করতে দেখেছেন। অন্য এক শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে অনেক শিক্ষক নিজেরা সামনে দাঁড়িয়ে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় স্কুলের বিভিন্ন ভবনে আতঙ্কিত শিক্ষার্থীদের কান্না, চিৎকার ও দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়।
আরও পড়ুন: ন্যাটোর আদলে নতুন সামরিক জোট গড়ছে সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তান
জরুরি উদ্ধারকর্মীদের প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, আতঙ্কিত শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে স্কুল ভবন থেকে বেরিয়ে আসছে। স্কুলের বাইরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল একাধিক অ্যাম্বুলেন্স। আহতদের স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসাকর্মীরা ঘটনাস্থলেই কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।
থাইল্যান্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা সংকটাপন্ন।
ননথাবুরি প্রাদেশিক পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, হামলার উদ্দেশ্য এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হামলাকারীর ব্যক্তিগত জীবন, মানসিক অবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ এবং স্কুলজীবনের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিশোরটির সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং তাকে হয়রানি (বুলিং) করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি থাই পুলিশ।
ঘটনার পর থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ করে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি স্কুলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে এসেছে।
২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ডেবসিরিন ননথাবুরি স্কুলে প্রায় ৩ হাজার ১০০ শিক্ষার্থী এবং ১৪৭ জন শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। থাইল্যান্ডের রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত ডেবসিরিন শিক্ষা নেটওয়ার্কের অংশ এই বিদ্যালয়টি দেশটির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এর সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষাবিদ, বিচারক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও রয়েছেন।
এটি চলতি বছরে থাইল্যান্ডে দ্বিতীয় বড় স্কুলে বন্দুক হামলা। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি স্কুলে বন্দুকধারীর হামলায় একজন প্রধান শিক্ষক নিহত এবং শিক্ষার্থীসহ আরও কয়েকজন আহত হন। এছাড়া ২০২৩ সালে ব্যাংককের সিয়াম প্যারাগন শপিংমলে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের গুলিতে কয়েকজন নিহত হন। ২০২২ সালে নং বুয়া লামফু প্রদেশের একটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে সাবেক এক পুলিশ সদস্যের হামলায় ৩৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের মালিকানার হার সবচেয়ে বেশি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় এক কোটি বেসামরিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক বন্দুক হামলার পর সরকার অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগের ঘোষণা দিলেও প্রাণঘাতী সহিংসতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ এই হামলার পর আবারও কঠোর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদার এবং কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








