আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৩:৩৮, ৬ আগস্ট ২০২৬

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জবাবে চীনের পাল্টাঘাত

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জবাবে চীনের পাল্টাঘাত

ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক শুল্ক, প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞার জবাবে এবার সরাসরি পাল্টা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিয়েছে বেইজিং। 

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একাধিক ঘোষণায় জানিয়েছে, সাতটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চীনের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ব্যবসা ও সহযোগিতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ড্রোন, ড্রোনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে কঠোর লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। 

এছাড়া মার্কিন পরিদর্শন সংস্থার কার্যক্রম স্থগিত, আমদানিকৃত অফিস সরঞ্জাম ও সফটওয়্যারের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা তদন্ত এবং পণ্য সনদ ব্যবস্থায় নতুন বিধিনিষেধ আরোপের মতো আরও কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে চলমান বাণিজ্য ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এখন নতুন এক উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

চীনের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া সাতটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অ্যারিজোনাভিত্তিক Compliance Testing LLC, Applied DNA Sciences, Stratum Reservoir, Altana Technologies, Responsible Business Alliance, Verité Group এবং Human Rights in China। 

বেইজিংয়ের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এমন নীতিমালা বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে, যা চীনা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছে এবং বিশেষ করে শিনজিয়াং ইস্যুতে চীনা কোম্পানির বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে ভূমিকা রেখেছে। ফলে এখন থেকে চীনের কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা এসব মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কিংবা অন্য কোনো ধরনের লেনদেন করতে পারবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ড্রোন ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে বেইজিং। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো প্রতিটি নিয়ন্ত্রিত ড্রোন, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির চালান পৃথকভাবে পর্যালোচনা করে লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া হবে। সরাসরি রপ্তানি নিষিদ্ধ করা না হলেও প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে মূল্যায়ন করায় অনুমোদন পেতে বেশি সময় লাগবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিলম্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৈশ্বিক ড্রোন উৎপাদনে চীনের আধিপত্য বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তি খাতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এছাড়া চীনের বাধ্যতামূলক CCC (China Compulsory Certification) পণ্য সনদ ব্যবস্থার আওতায় মার্কিনভিত্তিক যেসব সংস্থা চীনা কারখানায় পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করত, তাদের সেই অনুমতি স্থগিত করা হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকট্রনিক পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন বিকল্প আন্তর্জাতিক অডিটর বা পরিদর্শক নিয়োগ করতে হতে পারে, যা উৎপাদন ব্যয় ও সময় উভয়ই বাড়িয়ে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে আমদানিকৃত প্রিন্টার, ফটোকপি মেশিন, অফিস সরঞ্জাম এবং বিদেশি সফটওয়্যার ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা তদন্তও শুরু করেছে বেইজিং। যদিও কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে চীনা কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে এসব উদ্যোগ সাম্প্রতিক মার্কিন পদক্ষেপের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার অংশ।

আরও পড়ুন: মানুষ হত্যা নয়, ইরানের সঙ্গে চুক্তিতেই আগ্রহী ট্রাম্প

চীনের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ধারাবাহিকভাবে চীনের প্রযুক্তি খাতকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে চীনা টেলিকম অপারেটর, পরীক্ষাগার, ড্রোন, রাউটার, সাবমেরিন কেবল, অপটিক্যাল ট্রান্সসিভার, উন্নত রোবোটিক্স সরঞ্জাম, মানবাকৃতির রোবট, বিদ্যুৎ ইনভার্টারসহ একাধিক প্রযুক্তি পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা আমদানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। পাশাপাশি গত সপ্তাহে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে Uyghur Forced Labor Prevention Act (UFLPA)-এর আওতায় আরও ৪৩টি চীনা প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ তালিকায় যুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে চীনের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতের বিরুদ্ধেও নতুন নিষেধাজ্ঞার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করছে এবং এটি স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তার ভাষায়, সুরক্ষাবাদী নীতি গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করতে পারবে না; বরং এতে দুই দেশের কোম্পানি, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

তিনি বলেন, চীন তার প্রতিষ্ঠানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রাখবে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও একই ধরনের বার্তা দিয়ে বলেছেন, চীনা কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক পদক্ষেপের মুখে বেইজিংয়ের সামনে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। 

তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন নতুন করে চীনের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বেইজিং আরও কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কেউই সর্বাত্মক বাণিজ্য যুদ্ধের দিকে এগোতে চায় না। বরং উভয় দেশই লক্ষ্যভিত্তিক, খাতভিত্তিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর চাপ সৃষ্টির কৌশল অনুসরণ করছে। তবে ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত রোবোটিক্স, যোগাযোগ প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলকে কেন্দ্র করে যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তা আগামী মাসগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে আগামী সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের আগে এসব পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন চাপ সৃষ্টি করবে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়