মানুষ হত্যা নয়, ইরানের সঙ্গে চুক্তিতেই আগ্রহী ট্রাম্প
ফাইল ছবি
ইরানের সঙ্গে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে তিনি একটি সমঝোতামূলক চুক্তিতে পৌঁছাতে চান বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তার ভাষায়, যুদ্ধের চেয়ে কূটনৈতিক সমাধানই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশি কার্যকর ও কাঙ্ক্ষিত। তবে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিকল্পও উন্মুক্ত থাকবে বলে তিনি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
একই সঙ্গে তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, কোনো পরিস্থিতিতেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেওয়া হবে না।
স্থানীয় সময় বুধবার (০৫ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা অঙ্গরাজ্যের লাস ভেগাসে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি মানুষ হত্যা করতে চান না এবং যুদ্ধের পরিবর্তে একটি চুক্তি করতে আগ্রহী।
তার মতে, যদি আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান সম্ভব হয়, সেটিই হবে সবচেয়ে ভালো পথ।
তিনি বলেন, সামরিক অভিযান সবসময় শেষ বিকল্প হওয়া উচিত এবং কূটনীতির সুযোগ থাকলে সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
ট্রাম্প দাবি করেন, তার প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তেহরানের পক্ষ থেকে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করায় সেই পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়।
তিনি বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে হামলা না চালিয়ে আলোচনায় বসার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। পরে তারা বিষয়টি প্রকাশ্যে অস্বীকার করলেও বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কোনো দেশের ধ্বংস নয়; বরং এমন একটি সমঝোতা, যা দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করবে। তবে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা এবং মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ট্রাম্প বলেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে পারবে না। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার প্রশাসন এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধে কমছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার
জ্বালানি বাজার নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ট্রাম্প বলেন, ইরানকে ঘিরে চলমান অচলাবস্থা এবং নিরাপত্তা সংকটের অবসান ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও কমে আসবে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং পেট্রোলসহ জ্বালানি পণ্যের মূল্য হ্রাস পাবে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। যুদ্ধ বা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ তার উদ্দেশ্য নয়। বরং আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য।
তার দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর যে সংকটের কারণে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল ও জ্বালানি পরিবহন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল, তা নিরসনেও আলোচনা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ট্রাম্পের এসব দাবির বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। তেহরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ আলোচনার বিষয়টি প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছেন। ফলে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হওয়ার পেছনে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষ বড় ভূমিকা রেখেছে। গত জুনে দুই দেশ একটি কাঠামোগত সমঝোতার ভিত্তিতে আলোচনা শুরু করলেও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে সেই আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ে। পরে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। জবাবে ইরানও অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলার দাবি করে। এরপর মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে আবারও কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার হওয়ার খবর সামনে আসে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সংঘাতের সময় বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু না করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী বেসামরিক মানুষের জন্য অপরিহার্য স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের হামলা যুদ্ধাপরাধের আওতায়ও বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে ইরানও সতর্ক করেছে, তাদের ভূখণ্ডে বড় ধরনের হামলা হলে তারা আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্ক এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে। একদিকে আলোচনা অব্যাহত রাখার বার্তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে সামরিক বিকল্পও বহাল রাখছে। ফলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে, সেদিকেই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








