ইরান যুদ্ধে কমছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের সঙ্গে টানা পাঁচ মাস ধরে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক দূরপাল্লার হামলা সক্ষমতা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তথ্য সম্পর্কে অবগত একাধিক কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স, মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র শুধু হামলাকারী নয়, প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে চীন বা রাশিয়ার মতো সামরিক শক্তিধর প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাত দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা কতটা অক্ষুণ্ন থাকবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক, সামরিক পরিকল্পনাবিদ এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থলভিত্তিক দূরপাল্লার নির্ভুল হামলার অস্ত্র আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (ATACMS) এবং নতুন প্রজন্মের প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (PrSM)–এর প্রায় পুরো মজুতই চলমান যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় মধ্যপ্রাচ্যে সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) যে পরিমাণ স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছিল, তার প্রায় সবই ব্যবহার হয়ে গেছে। পরে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক মজুত থেকে নতুন সরঞ্জাম এনে সেই ঘাটতি আংশিকভাবে পূরণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ক্ষয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অস্ত্রভাণ্ডারেও। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (THAAD) ব্যবস্থার বিপুলসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।
কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, যুদ্ধ-পূর্ব মজুতের প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত THAAD ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়েছে। একই সময়ে প্যাট্রিয়ট (Patriot PAC-3) প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারও উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয়েছে। যদিও এসব সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি পেন্টাগন, তবে সিএনএন জানিয়েছে, সিএসআইএসের হিসাব এবং পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
সিএসআইএসের সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আনুমানিক ২ হাজার ৩০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট এবং ৪৫২টি THAAD ইন্টারসেপ্টর ছিল।
সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, প্যাট্রিয়টের মজুত ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়ে এক হাজারেরও নিচে নেমে এসেছে এবং THAAD ইন্টারসেপ্টরের সংখ্যাও প্রায় ২৫০-এর ঘরে নেমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো কেবল সংখ্যাগত ঘাটতি নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়, হামলাকারী অস্ত্রের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সূত্রগুলোর দাবি, যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুতেরও প্রায় অর্ধেকের কিছু কম ইতোমধ্যে ব্যবহার হয়েছে। নিরাপদ দূরত্ব থেকে শত্রুপক্ষের কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে টমাহক যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। একইভাবে, দূরপাল্লার নির্ভুল হামলার জন্য ব্যবহৃত PrSM এবং ATACMS–এর দ্রুত হ্রাস ভবিষ্যৎ যেকোনো বৃহৎ সংঘাতে মার্কিন পরিকল্পনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।
বিশ্লেষকদের মতে, ATACMS, PrSM, টমাহক, প্যাট্রিয়ট ও THAAD এই পাঁচ ধরনের অস্ত্রই সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে। কারণ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে নিরাপদ দূরত্ব থেকে নির্ভুল হামলা চালানোর ক্ষেত্রে এসব অস্ত্রের বিকল্প কার্যত নেই। ফলে ইরান যুদ্ধের কারণে এই অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ পরিকল্পনা নতুন করে মূল্যায়ন করতে হতে পারে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বর্তমান উৎপাদন হার বজায় থাকলে ব্যবহৃত THAAD ও প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের যুদ্ধ-পূর্ব মজুত পুনর্গঠন করতে অন্তত তিন বছর, কিছু ক্ষেত্রে তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা সোমবার, চুক্তির আশা ট্রাম্পের
সিএসআইএসের আরেক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, টমাহক ও THAAD-এর মতো অস্ত্র পুনরায় উৎপাদন করে আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে বহু বছর সময় প্রয়োজন হবে, কারণ এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির শিল্প সক্ষমতা এক দিনে বাড়ানো সম্ভব নয়।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পেন্টাগন সম্প্রতি লকহিড মার্টিন, নর্থরপ গ্রুম্যান এবং আরটিএক্স (সাবেক রেথিয়ন)-এর সঙ্গে কয়েক বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে, যার মাধ্যমে প্যাট্রিয়ট ও THAAD ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে। ইরান একাধিকবার উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারকারী দেশগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফলে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ আশঙ্কা করছে, বড় ধরনের পাল্টা হামলা হলে তাদের বিদ্যমান বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট নাও হতে পারে। এ ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগও ওয়াশিংটনের সামরিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও অস্ত্রের মজুত নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সামরিক কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে আসছিলেন যে প্যাট্রিয়ট ও THAAD–এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে বড় আকারের হামলা চালালে ভবিষ্যৎ কোনো বৈশ্বিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব মূল্যায়নই ইরানের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছিল। যদিও হোয়াইট হাউসের একটি অংশ দাবি করেছে, উপসাগরীয় মিত্রদের কূটনৈতিক উদ্বেগও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
তবে এসব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে হোয়াইট হাউস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এক বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
সেখানে তিনি দাবি করেন, বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনেক বেশি গোলাবারুদ রয়েছে, এমনকি প্রয়োজনের চেয়েও বেশি।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্প বর্তমানে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হারে গোলাবারুদ উৎপাদন করছে এবং নতুন কারখানা ও উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেলও।
তার ভাষ্য, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী যেকোনো সময়, যেকোনো অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রভাণ্ডারও সংরক্ষণ করছে।
তবুও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন ভিন্ন। তাদের মতে, উৎপাদন বাড়ানো হলেও আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে জটিল সরবরাহব্যবস্থা, বিশেষায়িত উপাদান এবং দীর্ঘ উৎপাদনচক্রের কারণে দ্রুত ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক প্রস্তুতি, প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত পরিকল্পনাকেও নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, অস্ত্রভাণ্ডার পুনর্গঠনের চাপও তত বাড়বে এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








