নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১০:০৭, ৪ জুন ২০২৬

আসছে ভয়ংকর সুপার এল নিনো, চরম বিপর্যয়ের শঙ্কায় বিশ্ব

আসছে ভয়ংকর সুপার এল নিনো, চরম বিপর্যয়ের শঙ্কায় বিশ্ব

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে জমতে থাকা অস্বাভাবিক উষ্ণতা এবং বৈশ্বিক জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিশ্ব আজ এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক সংকটের মুখোমুখি। 

জাতিসংঘ ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা অনুযায়ী, চলমান ২০২৬ সালেই পৃথিবী আরেকটি দানবীয় ‘এল নিনো’র কবলে পড়তে যাচ্ছে, যা কয়েক দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী বা একটি ‘সুপার এল নিনো’তে রূপ নিতে পারে। 

আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের একাংশ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মডেলের পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের আগেই এই এল নিনো গঠনের সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ এবং নভেম্বরের মধ্যে তা ৯০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ইতিমধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (প্রায় ৫.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বেশি রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিপজ্জনক সীমা বা ‘থ্রেশহোল্ড’ অতিক্রমের স্পষ্ট প্রমাণ। এই মহাসাগরীয় উষ্ণ জলরাশি ক্রান্তীয় অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার কারণে বৈশ্বিক আবহাওয়ার স্বাভাবিক রূপরেখা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিস্তীর্ণ অংশে।

ঐতিহাসিকভাবে এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের একটি সাময়িক প্রাকৃতিক চক্র, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং এর ফলে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে। সাধারণত এই পরিস্থিতি ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হলেও এবারের সম্ভাব্য সুপার এল নিনোর তীব্রতা চলতি শতাব্দীর সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

স্যাটেলাইট ও সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিকের চেয়ে কোথাও কোথাও ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি উষ্ণ বিশাল জলরাশি শত শত মিটার গভীরে ধীরে ধীরে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। 

যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিসের মাস থেকে দশকভিত্তিক পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কেইফ এবং মার্কিন জলবায়ু বিজ্ঞানী জিক হসফাদারের মতো বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, গভীর সমুদ্রের এই অতিরিক্ত তাপ যখন পানির উপরিতলে চলে আসবে, তখন এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করবে। 

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো যেভাবে ২০২৪ সালকে ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণতম বছরে পরিণত করেছিল, ঠিক তেমনি এবারের এল নিনোর প্রত্যাবর্তনের প্রভাবে ২০২৭ সাল বিশ্বের ইতিহাসে নতুন কোনো চরম তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি করবে।

এই আবহাওয়াগত বিপর্যয় শুধু তাপমাত্রার রেকর্ডিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বিশ্বজুড়ে চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া ও তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দেবে। 

ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্র, হর্ন অব আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ার কিছু অংশে ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হবে। এর বিপরীতে মধ্য ও উত্তর আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দেখা দেবে দীর্ঘস্থায়ী খরা, দাবানল ও তীব্র পানিসংকট। এই ধরনের চরম আবহাওয়া বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

আরও পড়ুন: প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত দেশের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ: আইওএম

ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’-এর তথ্যমতে, জলবায়ু সংকট এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার (যেমন ইরান যুদ্ধ) কারণে সার সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যবস্থা এমনিতেই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এর ওপর সুপার এল নিনোর প্রভাবে যদি টানা দুই ফসল উৎপাদন মৌসুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে ২০২৭ এবং ২০২৮ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের যোগান হ্রাস পাবে এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে, যা অতীতে শত শত বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়েছিল।

বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বদ্বীপ অঞ্চলের জন্য এই এল নিনোর প্রভাব হতে পারে অত্যন্ত মারাত্মক ও বহুমুখী। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এল নিনোর বছরে এ দেশে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে সামগ্রিক বার্ষিক বৃষ্টিপাত গড়ে প্রায় ১৪৫ মিলিমিটার পর্যন্ত কমে যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। বৃষ্টিপাতের এই ঘাটতির কারণে আমন ধানের জীবনকাল দীর্ঘায়িত হয়ে ধান পাকতে দেরি হচ্ছে এবং বোরো মৌসুমে সেচের জন্য তীব্র পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। তীব্র খরার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় কৃষকদের সেচ খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে, যা দেশের লক্ষ্যমাত্রিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে ১০ শতাংশের নিচে রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। শুধু কৃষিতেই নয়, তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে পুকুরের পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়ে মাছের মড়ক দেখা দেয়। পাশাপাশি পোল্ট্রি শিল্পে ‘হিট স্ট্রেস’-এর কারণে মুরগির মৃত্যুহার বৃদ্ধি ও ডিম উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার ফলে বাজারে প্রাণিজ আমিষের দাম সাধারণ মানুষের ভাতের থালাকে সংকটাপন্ন করে তুলছে। এমনকি দেশের বিদ্যুৎ খাতেও এটি ‘হিট পেনাল্টি’ হিসেবে আঘাত হানছে; তীব্র গরমে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ৫ থেকে ৭ শতাংশ কমে যায় এবং সোলার প্যানেলগুলোর কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়, যা চরম গরমে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

প্রকৃতির এই চরম বৈরিতা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি শুরু হলেও অর্থায়ন ও প্রযুক্তির কার্যকর বণ্টন এখন সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

ডব্লিউএমও-এর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো আক্ষেপ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন এখনও প্রয়োজনীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বড় দাতা দেশগুলো বৈদেশিক সহায়তা বাজেট কমিয়ে দেওয়ায় দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার তহবিল মারাত্মক সংকটে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্ব নেতাদের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার এবং প্রতিটি মানুষের কাছে আগাম সতর্কবার্তা প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। 

অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার ‘অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন’ বা আগাম প্রস্তুতির নীতি গ্রহণ করে খরা মোকাবিলায় খাল পুনর্খনন ও কৃষকদের সরাসরি ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা প্রদান শুরু করেছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং আইসিডিডিআর,বি-এর পক্ষ থেকেও তীব্র তাপপ্রবাহে শরীর ঠান্ডা রাখতে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ ও হালকা সুতি পোশাক পরাসহ কড়া রোদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের এই সুপার এল নিনো মানবজাতির প্রযুক্তি, সম্পদ ও সম্মিলিত অভিযোজন ক্ষমতার এক মহাপ্রশ্ন তৈরি করেছে, যার সঠিক উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়