প্রস্তুত বঙ্গভবন, শপথের অপেক্ষায় নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা
ছবি: সংগৃহীত
সরকার গঠনের প্রায় ছয় মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন করে কয়েকজন সংসদ সদস্যকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ অনুষ্ঠানের পরপরই নতুন মন্ত্রিসভা সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে শপথের জন্য যাদের ডাকা হয়েছে, তাদের কয়েকজন বঙ্গভবনে পৌঁছেছেন এবং দরবার হলে শপথের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের শপথ শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন; তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট।
মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের বিষয়ে শুক্রবার সকাল থেকেই একাধিক সূত্রে চারজনের নাম নিশ্চিতভাবে সামনে আসে। তারা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, বিএনপির জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, বান্দরবান আসনের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী এবং গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সূত্রের বরাতে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চারজনই শুক্রবার রাতে নতুন করে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে যাচ্ছেন এবং রাষ্ট্রপতির শপথের পর তাদের শপথ পড়ানো হবে।
তবে দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের সম্ভাব্য তালিকায় আরও কয়েকজনের নাম যুক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর একটি অংশের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরকে উপদেষ্টার পদ থেকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্বে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে বর্তমানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে পূর্ণ মন্ত্রী করার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। ফলে শপথের আগে পর্যন্ত নতুন করে যুক্ত হতে যাওয়া সদস্যের সংখ্যা চার, পাঁচ বা ছয় এ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত হুমায়ুন কবির ও রশিদুজ্জামান মিল্লাতের পদোন্নতিকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখাই সমীচীন।
এর আগে সরকারের ছয় মাস পূর্তিকে সামনে রেখে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদলের সম্ভাবনার খবরও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল এবং কয়েকজন প্রতিমন্ত্রীর পূর্ণমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা ছিল।
নতুন দায়িত্বের সম্ভাব্য বণ্টন নিয়েও একাধিক তথ্য সামনে এসেছে। একটি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ড. আবদুল মঈন খানকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। আর আন্দালিব রহমান পার্থকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে প্রতিমন্ত্রী এবং মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করার তথ্যও এসেছে।
অন্য একটি সূত্র আবার আবদুল মঈন খান, হুমায়ুন কবির, আন্দালিব রহমান পার্থ ও সাচিং প্রু জেরীকে পূর্ণ মন্ত্রী এবং শামীম কায়সার লিংকনকে প্রতিমন্ত্রী করার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ নামের তালিকা নিয়ে যে পর্যায়ের ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে এখনো ততটা নিশ্চিততা তৈরি হয়নি। শপথের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হলে কোন মন্ত্রণালয় কার অধীনে যাচ্ছে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান জানা যাবে।
ড. আবদুল মঈন খানের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় এবং অতীতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন। এবার তিনি নরসিংদী-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সরকারে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আরও একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক সরাসরি নির্বাহী দায়িত্বে আসছেন।
আরও পড়ুন: মন্ত্রিসভায় নতুন ৪ মুখ, দপ্তরে রদবদল
অন্যদিকে আন্দালিব রহমান পার্থকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে বিএনপির বাইরে থাকা জোটসঙ্গী একটি রাজনৈতিক শক্তিকেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনার বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে তিনি বিজয়ী হন; প্রকাশিত নির্বাচনী ফল অনুযায়ী তার প্রাপ্ত ভোট ছিল ১ লাখ ৫ হাজার ৫৪৩।
সাচিং প্রু জেরীর সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা অন্তর্ভুক্তিও আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। বান্দরবান আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন এবং এর আগে বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। পাহাড়ি অঞ্চলের প্রশাসন, উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন দাবিদাওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে তার নাম আসায় এ নিয়োগকে আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনও এবার প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় নির্বাহী দায়িত্বে আসতে যাচ্ছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তার নাম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। নির্বাচনী পর্যায়ের তথ্যেও গাইবান্ধা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তার নাম এবং পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সম্ভাব্য পদোন্নতি হলে সেটিও মন্ত্রিসভার পুনর্বিন্যাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হবে। তারেক রহমানের সরকার গঠনের সময় তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান। প্রাথমিক মন্ত্রিসভা গঠনের সময় প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে হুমায়ুন কবিরের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। পররাষ্ট্রনীতিতে বিএনপির হয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলটির যোগাযোগ ও কূটনৈতিক কর্মকৌশলে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি পর্যায়ের বৈঠকেও তাকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দেখা গেছে। ফলে তাকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হলে সরকারের পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় তাঁর ভূমিকা আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও সরাসরি হবে।
অন্যদিকে এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বর্তমানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। তিনি জামালপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামালপুর-১ আসনে তিনি ১ লাখ ৭২ হাজার ১১৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। সরকার গঠনের সময় তাকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখন তাকে পূর্ণমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এটি হবে মন্ত্রিসভার অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের সময় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার মূল সদস্যসংখ্যা ছিল ৫০। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়; তাদের মধ্যে পাঁচজনকে মন্ত্রী এবং পাঁচজনকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। নতুন সদস্য যুক্ত হলে মন্ত্রিসভার আকার যেমন বাড়বে, তেমনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের সুযোগও তৈরি হবে।
মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাসের সম্ভাব্য তালিকায় স্থানীয় সরকার, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং তথ্য ও সম্প্রচার ছাড়াও বিমান, কৃষি, খাদ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের আলোচনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনের সবগুলোই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।
এর আগে মন্ত্রিসভার ছয় মাস পূর্তিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কয়েকজন প্রতিমন্ত্রীকে পূর্ণমন্ত্রী করার সম্ভাবনা এবং নতুন কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই আলোচনার ধারাবাহিকতায় শুক্রবার বঙ্গভবনে নতুন সদস্যদের উপস্থিতি মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়াকে দৃশ্যমান করে তুলেছে।
এদিকে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথকে কেন্দ্র করে শুক্রবার বঙ্গভবনে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৯ জন সংসদীয় ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দেন। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় এবারের শপথ অনুষ্ঠানও রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১ হাজার ২০০-এর বেশি অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানোর তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
রাষ্ট্রপতির শপথের পর একই দরবার হলে নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে শুক্রবার রাতেই তারেক রহমানের সরকারের মন্ত্রিসভার নতুন চেহারা স্পষ্ট হয়ে যাবে। বিশেষ করে ড. আবদুল মঈন খান, আন্দালিব রহমান পার্থ, সাচিং প্রু জেরী ও মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনের শপথের বিষয়টি একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়ায় তাদের অন্তর্ভুক্তি এখন সবচেয়ে দৃশ্যমান। পাশাপাশি হুমায়ুন কবির ও এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতের পদোন্নতির আলোচনা বাস্তবায়িত হয় কি না, সেটিও নজরে রয়েছে। সবশেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনই নির্ধারণ করবে নতুন সদস্যের চূড়ান্ত সংখ্যা, পদমর্যাদা এবং কে কোন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের দায়িত্ব পাচ্ছেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








