আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৩:৫৩, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুদানে স্বর্ণখনি ধসে নিহত ৮২, নিখোঁজ অনেকে

সুদানে স্বর্ণখনি ধসে নিহত ৮২, নিখোঁজ অনেকে

ছবি: সংগৃহীত

সুদানের পশ্চিম কর্দোফান রাজ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক স্বর্ণখনির একাধিক সংযুক্ত সুড়ঙ্গ ধসে অন্তত ৮২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৫০ জন। ধসে পড়া মাটি ও পাথরের নিচে এখনও কতজন আটকা পড়ে আছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উদ্ধারকাজ চলছে অত্যন্ত সীমিত সরঞ্জাম দিয়ে। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিম কর্দোফানের আল-নুহুদ শহরের কাছে আল-জারা স্বর্ণখনিতে। 

এএফপি, এপি, রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে দুর্ঘটনাটিকে সুদানের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র পরিসরের স্বর্ণখনি খাতের ঝুঁকির সর্বশেষ বড় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও এএফপির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার আল-জারা খনির কয়েকটি পরস্পরসংযুক্ত সুড়ঙ্গে ধস শুরু হয়। পরদিন বুধবার সকাল পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা ৬০টি মরদেহ বের করতে সক্ষম হন। পরে আরও ২২টি মরদেহ উদ্ধার করা হলে নিহতের সংখ্যা ৮২-তে পৌঁছায়। 

পশ্চিম কর্দোফান নিয়ন্ত্রণকারী আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, এ ঘটনায় ৫০ জন আহত হয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে ঠিক কতজন আটকা রয়েছেন, তা এখনো জানা যায়নি। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, উদ্ধারকাজ চলছে অত্যন্ত সাধারণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে।

দুর্ঘটনার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের বর্ণনায়। খাইর আল-সাইয়েদ জাবারা নামের এক শ্রমিক জানান, তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে সারা রাত নিজেদের ব্যবহৃত সাধারণ খনিশ্রমের সরঞ্জাম দিয়েই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিত ও মৃতদের উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পাথর ও মাটি সরাতে ভারী যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হওয়ায় কাজটি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। 

এপি জানিয়েছে, ৩০ মিটারের বেশি গভীর অংশে উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ছিল না; একটি ফর্কলিফটই মূল ভারী যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

আরেক শ্রমিক আমিন সুলেইমানের ভাষ্য, আল-জারা এলাকায় পাশাপাশি থাকা সুড়ঙ্গগুলো একে অপরের খুব কাছাকাছি। একটি সুড়ঙ্গে ধস নামলে পাশের সুড়ঙ্গগুলোও ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। 

স্থানীয় সূত্রগুলোর মতে, এবারের দুর্ঘটনাতেও পরস্পরসংযুক্ত কয়েকটি সুড়ঙ্গ একসঙ্গে ধসে পড়ায় প্রাণহানি এত বেশি হয়েছে। আলগা ও বালুময় মাটির কারণে উদ্ধারকাজের সময় নতুন করে ধসের আশঙ্কাও রয়েছে।

কর্দোফান অবজারভেটরি জানিয়েছে, নিহতদের বড় অংশই ক্ষুদ্র পরিসরে স্বর্ণ উত্তোলনে নিয়োজিত শ্রমিক। ঘটনাস্থলে কোনো বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। স্থানীয় বাসিন্দা ও সহকর্মীরাই হাতের কাছে থাকা সরঞ্জাম দিয়ে মাটি ও বালু সরিয়ে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন। 

সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্কও জানিয়েছে, উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। স্থানীয় সূত্রগুলো খনিতে শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির কথাও জানিয়েছে।

আল-জারা খনির দুর্ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে স্বর্ণ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, সংঘাতের অর্থায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সুদানের সেনাবাহিনী ও র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় বহু তরুণ ঝুঁকিপূর্ণ স্বর্ণ অনুসন্ধান ও ক্ষুদ্র পরিসরের খনির কাজে যুক্ত হয়েছেন। পশ্চিম কর্দোফানসহ বিভিন্ন এলাকায় অনিবন্ধিত খনি, পুরোনো খনি ও পরিত্যক্ত খনির সুড়ঙ্গেও শ্রমিকরা জীবিকার সন্ধানে প্রবেশ করছেন।

আরও পড়ুন: নেপালের হিমবাহ ধসের নেপথ্য কারণ জানালেন বিজ্ঞানীরা

সুদানের স্বর্ণ খাতের বড় অংশই ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খনির ওপর নির্ভরশীল। শ্রমিকরা অনেক ক্ষেত্রে হাত ও সাধারণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে মাটি ও পাথর থেকে স্বর্ণ আলাদা করেন। কোথাও পুরোনো ও পরিত্যক্ত খনির সুড়ঙ্গ পুনরায় ব্যবহার করা হয়, আবার কোথাও সরকারি অনুমোদন বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই নতুন গর্ত ও সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়। ফলে ধস, বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং অন্যান্য কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনার ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই এই খাতে বিদ্যমান।

স্বর্ণ উত্তোলনের সঙ্গে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও জড়িত। ক্ষুদ্র পরিসরের অনেক খনিতে আকরিক থেকে স্বর্ণ আলাদা করতে পারদ ও সায়ানাইডের মতো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের রাসায়নিকের অনিরাপদ ব্যবহার শ্রমিকদের পাশাপাশি খনির আশপাশের মানুষের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণেই চলতি বছরের জুলাইয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সুদানের যুদ্ধ অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির স্বর্ণ বাণিজ্য ও স্বর্ণ উত্তোলনে ব্যবহৃত কিছু উপকরণের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

১৩ জুলাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিল সুদানে উৎপাদিত স্বর্ণ কেনা, আমদানি বা হস্তান্তর নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে সুদানে পারদ ও সায়ানাইড বিক্রি, সরবরাহ, হস্তান্তর বা রপ্তানিও নিষিদ্ধ করা হয়। ইইউ বলেছে, স্বর্ণ সুদানের সংঘাত টিকিয়ে রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস এবং এসব ব্যবস্থা যুদ্ধের অর্থায়নের উৎস সীমিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। 

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১৫ জুলাই ২০২৬-এর পর সুদান থেকে রপ্তানি হওয়া স্বর্ণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞাটি প্রযোজ্য।

যুক্তরাজ্যও জুলাইয়ে সুদানের অবৈধ স্বর্ণ বাণিজ্য ও যুদ্ধের অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। 

ব্রিটিশ সরকারের হিসাবে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সুদানের সরকারি স্বর্ণ রপ্তানির মূল্য ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। তবে প্রকৃত স্বর্ণ বাণিজ্যের মূল্য এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হতে পারে এবং প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ অবৈধ পথে দেশ থেকে বেরিয়ে যায় বলে যুক্তরাজ্য জানিয়েছে।

সুদানের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে ৭০ টন স্বর্ণ উৎপাদিত হয়েছিল, যা আগের পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। 

সুদানের খনিজ সম্পদ খাতের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর খাতটি থেকে সরকারি রাজস্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। তবে উৎপাদন ও রপ্তানির সরকারি হিসাবের বাইরে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ অবৈধ পথে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

স্বর্ণের এই বাণিজ্যের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। ইইউর নথিতে বলা হয়েছে, সুদানের সেনাবাহিনী (SAF) ও র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF) উভয় পক্ষের জন্যই স্বর্ণ উত্তোলন ও স্বর্ণ বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। ব্রিটিশ সরকারও বলেছে, দেশটির স্বর্ণভিত্তিক অর্থনীতি যুদ্ধের অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে সুদানের স্বর্ণের একটি বড় অংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে পাচার হওয়ার কথাও উঠে এসেছে; এ বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত অবশ্য ব্যাপকভাবে আরএসএফকে অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সুদানে খনি ধস অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। অনিয়ন্ত্রিত ও পুরোনো খনির সুড়ঙ্গ ব্যবহারের কারণে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অতীতেও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে। 

এপি জানিয়েছে, ২০২১ ও ২০২৩ সালেও সুদানে খনি ধসে বহু শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন। ফলে আল-জারার সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা দেশটির অনানুষ্ঠানিক খনি খাতের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

আল-জারা খনিতে উদ্ধার অভিযান এখনো শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রকৃতপক্ষে কতজন রয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ জীবিত আছেন কি না এবং নতুন করে কতটি মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হবে এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে উদ্ধারকারীদের কাছে ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছানো এবং বালুময়, অস্থিতিশীল মাটির মধ্যে নিরাপদে কাজ করার ওপর। আপাতত স্থানীয় শ্রমিক ও বাসিন্দারাই সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়