নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১২:২২, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আপডেট: ১৩:৩৯, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টিসিবির ভর্তুকি ৪-৫ বছরের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে আনা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

টিসিবির ভর্তুকি ৪-৫ বছরের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে আনা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

ফাইল ছবি

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রমকে ধীরে ধীরে ভর্তুকিনির্ভরতা থেকে বের করে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে টিসিবির ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। একই সঙ্গে উপকারভোগীর তালিকা শুদ্ধিকরণ, স্মার্ট কার্ডের ডিজিটাল রূপান্তর, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর করার মাধ্যমে টিসিবির কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) টিসিবির কার্ডধারীদের সুবিধার জন্য উপকারী মোবাইল অ্যাপ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনার কথা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এর আগে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে টিসিবির পণ্য বিক্রি কার্যক্রম উদ্বোধন উপলক্ষেও তিনি সংস্থাটির উপকারভোগী তালিকা ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, টিসিবির আগের এক কোটি উপকারভোগীর তালিকা যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে প্রায় ৫৯ লাখের তথ্য প্রশ্নবিদ্ধ বা ভুয়া হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এ তালিকা পর্যালোচনার পর বর্তমানে প্রায় ৮০ লাখ প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে আরও ২০ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথা আগেই জানিয়েছিলেন তিনি।

টিসিবির উপকারভোগী ব্যবস্থাপনায় এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। মন্ত্রীর ভাষ্য, টিসিবির কার্ড ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তরের ফলে বছরে প্রায় ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। এর ফলে একদিকে ভুয়া বা অনুপযুক্ত কার্ড শনাক্ত করা সহজ হবে, অন্যদিকে প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে জবাবদিহি বাড়বে। কার্ড হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলেও যাতে সংশ্লিষ্ট পরিবার টিসিবির পণ্য থেকে বঞ্চিত না হয়, সে ব্যবস্থাও ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

টিসিবির কার্যক্রমে ডিজিটাল রূপান্তর অবশ্য নতুন নয়। সংস্থাটি ইতোমধ্যে ডিলার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম চালু করেছে। জুন ২০২৬-এ টিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নতুন ডিলার নিয়োগের জন্য অনলাইনে আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড, আবেদন-অবস্থা রিয়েল টাইমে যাচাই এবং জেলা-উপজেলা-ইউনিয়নভিত্তিক শূন্য পদের তথ্য দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এবার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রেও আরও স্বচ্ছতা আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। 

তিনি জানান, অনলাইন ডিলার সিস্টেম চালু করা হবে। কোনো এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় আবেদনকারী বেশি হলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লটারি করে ডিলার নির্বাচন করা হবে। এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ কমানোর পাশাপাশি আবেদন ও বাছাই প্রক্রিয়াকে আরও সহজে যাচাই করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র: মাহ্দী আমিন

টিসিবির ভর্তুকি কমিয়ে আনার পরিকল্পনার পেছনে মূল লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে সংস্থাটির পরিচালন ব্যয় ও অপচয় কমানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকারিতা বাড়ানো। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে টিসিবির কার্যক্রম নিয়ে তৎকালীন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছিলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর মাধ্যমে ওই অর্থবছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে টিসিবির কার্যক্রমে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজন থাকবে না বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের জন্য টিসিবির খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখার কথাও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। 

গত মে মাসে ঈদুল আজহা উপলক্ষে টিসিবির ট্রাকসেল কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বিশেষ পরিস্থিতি, উৎসব কিংবা বাজারে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রাকসেল চালু রাখা হবে। একই সঙ্গে স্মার্ট কার্ডধারী পরিবারের জন্য নিয়মিত ভর্তুকিমূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহ কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে।

ঈদুল আজহার ওই কার্যক্রমে সারাদেশে ৭২০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ১১ থেকে ২১ মে পর্যন্ত শুক্রবার ছাড়া ১০ দিন চলা ওই কর্মসূচিতে প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার উপকারভোগীর কাছে প্রায় ১৩ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন পণ্য বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

টিসিবির নিয়মিত কার্যক্রমের পরিসরও এখনো বড়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, টিসিবির মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৭৮ লাখ পরিবারকে ভর্তুকিমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ভর্তুকি ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের পরিকল্পনা থাকলেও স্বল্প ও নিম্নমধ্যম আয়ের বিপুলসংখ্যক পরিবারের খাদ্য সহায়তার সঙ্গে টিসিবির কার্যক্রম এখনো সরাসরি যুক্ত।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশে পণ্য সরবরাহ ও সাপ্লাই চেইনের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। এ কারণে বাজারে এখনো কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আসেনি। টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে পণ্য সরবরাহের পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার এই বৈষম্য কমানো এবং বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনায় তাই শুধু কার্ডধারীর সংখ্যা কমানো বা ভর্তুকি কমানো নয়, বরং কার কাছে পণ্য যাচ্ছে, কীভাবে যাচ্ছে এবং কোন পর্যায়ে কতটা অপচয় হচ্ছে এসব বিষয় ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

টিসিবির পুরোনো উপকারভোগী তালিকা সংস্কারের বিষয়টিও এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মে মাসে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আগের এক কোটি উপকারভোগীর তালিকায় প্রায় ৫৯ লাখের তথ্য প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। যাচাই-বাছাইয়ের পর ৮০ লাখ প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়েছে এবং আরও ২০ লাখ পরিবারকে পর্যায়ক্রমে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সময়ে ঈদুল আজহার আগে টিসিবির পণ্য সরবরাহ বাড়িয়ে প্রায় ২ কোটি ৮৮ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল।

সব মিলিয়ে টিসিবির সামনে এখন দুটি সমান্তরাল লক্ষ্য একদিকে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে সরকারি ভর্তুকির ওপর সংস্থাটির নির্ভরতা কমিয়ে আনা। ডিজিটাল কার্ড, উপকারী অ্যাপ, অনলাইন ডিলার নিয়োগ, সম্ভাব্য ক্ষেত্রে ডিজিটাল লটারি এবং উপকারভোগীর তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে সেই রূপান্তরের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। 

সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সংস্কারগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে টিসিবির ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে এগোনো সম্ভব হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়