‘রক্তপাত ছাড়াই পারমাণবিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করেছে ইরান চুক্তি’
ফাইল ছবি
ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালে বিশ্বশক্তির স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি (Joint Comprehensive Plan of Action-JCPOA) নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে জোরালো সাফাই গেয়েছেন।
ওবামা দাবি করেছেন, কোনো প্রকার রক্তপাত, আঞ্চলিক সংঘাত কিংবা সামরিক শক্তির ব্যবহার ছাড়াই তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল এই কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে।
তার মতে, এটি সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের যুদ্ধ এড়ানোর এটি ছিল আধুনিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে একটি উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা-ঝুঁকি মোকাবিলা করা হয়।
ওবামা বলেন, ওই চুক্তির আওতায় ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের অধীনে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল, যা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নেও কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, তৎকালীন মার্কিন এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইরানের প্রায় ৯৭ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্টকপাইল নিয়ন্ত্রণ ও স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছিল, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের পথে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে।
তার ভাষায়, “আমরা কোনো ক্ষেপণাস্ত্র না ছুড়েই এটি করেছি” যা তিনি কূটনৈতিক সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: মার্কিন তেল যাচ্ছে চীনে, ইরান-অস্ত্র নিয়ে বেইজিংয়ের নতিস্বীকার
সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, জেসিপিওএ কার্যকর থাকাকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের কোনো বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হয়নি, এমনকি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারত।
তার মতে, চুক্তিটি শুধুমাত্র ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় আকারের যুদ্ধের সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বিশেষ করে আল-জাজিরা, রয়টার্স ও নিউইয়র্ক টাইমসের পূর্ববর্তী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জেসিপিওএ কার্যকর থাকাকালীন ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত পর্যায়ে নামিয়ে আনে এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-কে নিয়মিত পরিদর্শনের সুযোগ দেয়। এই প্রক্রিয়াকে তখন পশ্চিমা কূটনৈতিক মহল একটি “যাচাইযোগ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা” হিসেবে বর্ণনা করেছিল, যদিও চুক্তিটি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র বিভাজন সৃষ্টি করেছিল।
তবে ওবামা তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইঙ্গিত দেন যে, চুক্তিটির কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাস্তব ফলাফল ছিল স্পষ্ট এবং পরিমাপযোগ্য। তাঁর দাবি, সামরিক শক্তি প্রয়োগ ছাড়াই একটি জটিল নিরাপত্তা সংকট সমাধান করা সম্ভব হয়েছিল, যা ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি পরোক্ষভাবে সমালোচনা করেন সেইসব নীতিকে, যেখানে কূটনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে সামরিক শক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে একতরফাভাবে সরে গিয়ে পুনরায় ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যার ফলে জেসিপিওএ কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইরান ধীরে ধীরে তার পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু অংশ পুনরায় সম্প্রসারণ শুরু করে এমন মূল্যায়নও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে ওবামার সাম্প্রতিক মন্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক জেসিপিওএর কূটনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা পুনরায় আলোচনায় আনার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








