মার্কিন তেল যাচ্ছে চীনে, ইরান-অস্ত্র নিয়ে বেইজিংয়ের নতিস্বীকার
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শুল্ক যুদ্ধ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন ছাপিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বেইজিংয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার দুই ঘণ্টারও বেশি সময়ব্যাপী রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উঠে এসেছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রগতির ঘোষণা। জ্বালানি তেল আমদানি, ক্রেডিট কার্ড বাজারের প্রবেশাধিকার এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা রোধে দুই দেশ একযোগে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই সফরকে বিশ্লেষকরা দেখছেন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার প্রচেষ্টা হিসেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের সঙ্গে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে কেন্দ্র করে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে একাধিক বড় অগ্রগতির দাবি করেছেন।
বেইজিং সফরের সময় শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি তেল, কৃষিপণ্য এবং শিল্পপণ্য আমদানিতে চীন নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে, যা দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, চীন বিশেষ করে টেক্সাস, লুইজিয়ানা ও আলাস্কা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তেল আমদানিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। একই সঙ্গে সয়াবিন ও পোলট্রিসহ মার্কিন কৃষিপণ্য ক্রয় বাড়ানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেন, চীনের বাজারে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড খাতে ভিসা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি পূর্ববর্তী শুল্ক ও বাণিজ্য যুদ্ধ-পরবর্তী সম্পর্কের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার ইঙ্গিত দেন।
বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময়ের এই বৈঠককে উভয় পক্ষই “গঠনমূলক” এবং “স্থিতিশীল সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা আগামী কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে স্থিতিশীল ও কৌশলগত কাঠামোর মধ্যে রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন। আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি, স্বাস্থ্য, পর্যটন এবং আইন প্রয়োগ সহযোগিতার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
আরও পড়ুন: শি জিনপিংকে প্রশংসায় ভাসালেন ট্রাম্প, বেইজিং বৈঠকে বন্ধুত্বের উষ্ণ বার্তা
হোয়াইট হাউসও বৈঠককে ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করে জানায়, মার্কিন ও চীনা ব্যবসায়ী নেতারাও আলোচনায় অংশ নেন, যা বেসরকারি খাতে সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে বৈঠকের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক ছিল মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ইরান ইস্যু। ট্রাম্প দাবি করেন, চীন ইরানকে কোনো ধরনের সামরিক সহায়তা না দেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে এবং একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদিও চীনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সীমিত মন্তব্য করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরানের ওপর চীনের প্রভাব ব্যবহার করে আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। একই সময় ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, চীন ইরান থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখলেও যুক্তরাষ্ট্র এতে সরাসরি আপত্তি তুলবে না, যা বৈশ্বিক জ্বালানি কূটনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক কেবল বাণিজ্যিক সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের বৃহত্তর পুনর্গঠনের একটি ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ করে তাইওয়ান, হরমুজ প্রণালি এবং ইরান সংকটকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কৌশলগত অবস্থান আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে যেমন চীনের অর্থনৈতিক “উন্মুক্তকরণ” এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর দাবি উঠে এসেছে, তেমনি শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে তাইওয়ান ইস্যুতে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার বার্তাও স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে চীন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি ও শিল্পখাতে “জাতীয় আত্মনির্ভরশীলতা” জোরদার করার কৌশল অব্যাহত রেখেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বেইজিং বৈঠক যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে সাময়িক শীতলতা বা কৌশলগত পুনঃসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে তাইওয়ান, ইরান এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ইস্যুতে গভীর মতপার্থক্য এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই দুই পরাশক্তির সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে এগোয়, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








