আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৩৪, ১৩ মে ২০২৬

বেইজিং পৌঁছালেন ট্রাম্প, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

বেইজিং পৌঁছালেন ট্রাম্প, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত শীর্ষ বৈঠককে কেন্দ্র করে বেইজিংয়ে শুরু হয়েছে এক উচ্চমাত্রার কূটনৈতিক তৎপরতা, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি খাতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। 

প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চীন সফর হিসেবে বিবেচিত এই রাষ্ট্রীয় সফরে ট্রাম্প বুধবার স্থানীয় সময় বেইজিং পৌঁছান, যেখানে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা, সামরিক গার্ড অব অনার এবং শিশুদের পতাকা হাতে অভ্যর্থনার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানায় চীন। সফরটি তিন দিনের হলেও মূল রাজনৈতিক গুরুত্ব কেন্দ্রীভূত হয়েছে দুই দিনের শীর্ষ বৈঠকে, যেখানে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই নেতার মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই সফর শুরু থেকেই বৈশ্বিক নজর কাড়ে তার সফরসঙ্গীদের তালিকার কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের একাধিক প্রধান নির্বাহী যাদের মধ্যে আছেন অ্যাপলের টিম কুক, টেসলা ও স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক, ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্ক এবং অন্যান্য টেক জায়ান্টদের প্রতিনিধিরা এই সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বৈঠকের কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ খাতও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে এনভিডিয়ার উন্নত এআই চিপ রপ্তানি, চীনা বাজারে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বহু বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক চুক্তি পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়গুলো আলোচনায় অগ্রাধিকার পেতে পারে।

সফরের মূল কূটনৈতিক এজেন্ডার কেন্দ্রে রয়েছে তাইওয়ান ইস্যু। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও দ্বীপটির সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট অনুযায়ী দ্বীপটির নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত থাকলেও চীন এটিকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে। সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং আবারও এটিকে “লাল রেখা” হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং সতর্ক করে দিয়েছে যে এই সীমারেখা অতিক্রম করা হলে তা গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রি ও সামরিক সহায়তা নিয়েও চাপ সৃষ্টি করেছে চীন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।

আরও পড়ুন: ইরানে গোপন হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব

অন্যদিকে ওয়াশিংটনও তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থান বজায় রেখেছে, যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে অস্ত্র বিক্রি ও সামরিক সহায়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের স্থগিত অস্ত্রচুক্তির ভবিষ্যৎ এই বৈঠকে নতুন মোড় নিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা, যা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

বাণিজ্য ও শুল্কনীতি এই বৈঠকের আরেকটি বড় কেন্দ্রীয় ইস্যু। গত দেড় বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের ফলে বাণিজ্যযুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যায়, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক হার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উভয় দেশ উত্তেজনা কিছুটা প্রশমনের চেষ্টা করেছে, তবে নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তি সীমাবদ্ধতা এখনো বহাল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর ইরান-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞাও আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যার জবাবে বেইজিং বিকল্প অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে।

এই সফরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং বিশেষ করে ইরান পরিস্থিতিও আলোচনায় প্রভাব ফেলছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। চীন এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে, কারণ তাদের জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ এই অঞ্চল নির্ভর। 

তবে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের চীনের মধ্যস্থতার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই, যা দুই দেশের অবস্থানগত পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করেছে।

চীনের কূটনৈতিক অবস্থানও এই বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রকে চারটি “লাল রেখা” মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে, যার মধ্যে তাইওয়ান, চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং উন্নয়ন অধিকার অন্যতম। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তাইওয়ান ইস্যু এই আলোচনার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হবে এবং এটি দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকের ফলাফল শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর চীনা বাজারে প্রবেশাধিকার, এআই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, সামরিক ভারসাম্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা সবকিছুই এই আলোচনার পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। ফলে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ বৈঠককে আন্তর্জাতিক মহল একটি সম্ভাব্য “টার্নিং পয়েন্ট” হিসেবে বিবেচনা করছে, যেখানে দুই পরাশক্তির সম্পর্ক নতুন সহযোগিতা বা নতুন উত্তেজনার পথে যেতে পারে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়