News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:৫৮, ৫ মার্চ ২০২৬
আপডেট: ১৫:৪৯, ৫ মার্চ ২০২৬

সৌদিতে ড্রোন হামলা: প্রতিরক্ষা চুক্তি মানলে যুদ্ধে নামতে হবে পাকিস্তানকে

সৌদিতে ড্রোন হামলা: প্রতিরক্ষা চুক্তি মানলে যুদ্ধে নামতে হবে পাকিস্তানকে

ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় সাম্প্রতিক এক আত্মঘাতী ড্রোন হামলাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি। এই হামলার রেশ ধরে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান চলমান এই আঞ্চলিক সংঘাতের সরাসরি পক্ষ হয়ে উঠবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো আলোচনা ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এসএমডিএ) এখন টক অফ দ্য টাউন।

সম্প্রতি সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় ইরানি ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে অভিযোগ ওঠে। তবে তেহরান এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে জানিয়েছে, তারা ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ সৌদি আরবে কোনো হামলা চালায়নি; বরং ঘটনাটি ইসরায়েলের পরিচালিত একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন হতে পারে বলে দাবি করেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে যা সামনে এসেছে, তা পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

গত মঙ্গলবার (০৩ মার্চ) এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। দারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আরাঘচিকে জানান যে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদির মাটি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা চান।

এই প্রেক্ষাপটে আলোচনায় এসেছে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএমডিএ)’। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রিয়াদের ইয়ামামা প্যালেসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করেন। চুক্তিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের যে কোনো একটির ওপর হামলাকে উভয়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং সে ক্ষেত্রে যৌথ ও সমন্বিত পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

আরও পড়ুন: এবার ইকুয়েডরে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু

চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, এটি দুই দেশের নিরাপত্তা জোরদার, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধির অঙ্গীকার বহন করে। তবে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন হলো- এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান কি সৌদি আরবকে কার্যত তার পারমাণবিক সুরক্ষা ছাতার আওতায় এনেছে?

পাকিস্তান এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক মহলের পর্যবেক্ষণে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল কাতারের রাজধানী দোহায় বিমান হামলা চালানোর পর উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। এরপর থেকেই রিয়াদ বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খোঁজার দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

এই প্রেক্ষাপটে এসএমডিএ চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) এবং জাতিসংঘের পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তির (টিপিএনডব্লিউ) নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না- তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপের পক্ষে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন আইক্যানের এক প্রতিবেদনে লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউজের বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, এই চুক্তি এনপিটি কাঠামোর বাইরে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ‘বর্ধিত প্রতিরোধ নীতি’র একটি নতুন নজির স্থাপন করতে পারে, যদিও এতে সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্রের উল্লেখ নেই।

তবে কূটনৈতিক মহলের অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরাসরি ইরানবিরোধী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। বরং দেশটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে সৌদি আরবের অবস্থানকে সমর্থন জোগাতে পারে। এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যও সতর্কবার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ; সৌদি আরবের হয়ে সামরিকভাবে অংশ নেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

ফলে প্রশ্নটি আপাতত উন্মুক্তই থাকছে- এসএমডিএ কি কেবল কৌশলগত বার্তা, নাকি এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা স্থাপত্যে একটি বাস্তব সামরিক প্রতিশ্রুতির সূচনা? পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতির ওপরই নির্ভর করবে পাকিস্তানের অবস্থান কতটা কূটনৈতিক থাকবে, আর কতটা সামরিক রূপ নেবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়