৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাস: দুই বছরে ৯ মৃত্যু, সতর্কবার্তা আইইডিসিআরের
ফাইল ছবি
দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাইরাসটির বিস্তার, সংক্রমণের ধরন এবং মৃত্যুহার ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মোট ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার (০৭ জানুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীতে আইইডিসিআরের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি বিষয়ে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন।
সভায় জানানো হয়েছে, বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৫টিতেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। গত দুই বছরে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া ৯ জনের সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ জন আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সর্বশেষ এক রোগী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয়, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণের ধরনে উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণত শীতকালে খেজুরের কাঁচা রস পানের মাধ্যমে এই সংক্রমণ ছড়ালেও সম্প্রতি প্রথমবারের মতো দেশে ‘অ-মৌসুমি কেস’ শনাক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে নওগাঁর এক ৮ বছর বয়সী শিশুর শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়, যা প্রচলিত শীতকালীন সংক্রমণের ধারণাকে বদলে দিয়েছে। শিশুটি বাদুড়ের আধা খাওয়া ফল (কালোজাম, খেজুর ও আম) খাওয়ার মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছিল। এই ঘটনাটি নিপাহ ভাইরাসকে এখন সারা বছরের হুমকিতে পরিণত করেছে।
আরও পড়ুন: ঢাকা শহর কিউলেক্স মশার আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে: ডুরা
সভায় উপস্থাপিত প্রবন্ধে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা জানান, নিপাহ ভাইরাস একটি অত্যন্ত মারাত্মক ব্যাধি। বিশ্বব্যাপী এর গড় মৃত্যুহার ৭২ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে গত দুই বছরে আক্রান্তদের শতভাগই মারা গেছেন। সংক্রমণের উৎস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৭২ শতাংশ রোগী কাঁচা খেজুরের রস পানের মাধ্যমে এবং বাকি ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সুস্থ মানুষের দেহে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাটে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।
আইইডিসিআরের সংক্রামক রোগ বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী ও নিপাহ ভাইরাস জরিপ সমন্বয়কারী ডা. সৈয়দ মঈনুদ্দিন সাত্তার বলেন, ২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারী জেলায় চারজন রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন এবং তাদের প্রত্যেকেই মারা গেছেন। যেহেতু এই ভাইরাসের কোনো কার্যকর টিকা বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি নেই, তাই জনসচেতনতাই এখন প্রধান সুরক্ষা।
ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি হাসপাতালগুলোকে জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নাজমুল হোসেনসহ বিশেষজ্ঞরা সভায় উপস্থিত হয়ে সতর্কবার্তা দেন যে, নিপাহ এখন আর শুধু শীত বা খেজুরের রসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাদুড়ের লালা বা মূত্র লেগে থাকা যেকোনো ফল খাওয়ার মাধ্যমে সারা বছরই মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় গণমাধ্যমকে অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।
নিপাহ ভাইরাস থেকে রক্ষায় আইইডিসিআর জরুরি ভিত্তিতে কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে। প্রথমত, কোনো অবস্থাতেই খেজুরের কাঁচা রস পান করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, আংশিক খাওয়া বা পাখির ঠোকর দেওয়া ও পোকায় কাটা ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যেকোনো ফলমূল পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, রোগীর সংস্পর্শে এলে নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে বিলম্ব না করে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








