ডেঙ্গুতে আরও ১ মৃত্যু, হাসপাতালে ১৫৩ ভর্তি
ফাইল ছবি
দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী থাকায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১৫৩ জন ডেঙ্গুরোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে চলতি বছরের শুরু থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৩১০ জনে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছেছে ৫৪ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জুলাই মাসজুড়েই সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে এবং বর্ষা মৌসুমের প্রভাবে আগামী সপ্তাহগুলোতেও রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক সর্বশেষ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৫৩ জন রোগীর মধ্যে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬ জন এবং ঢাকা বিভাগের (মহানগরের বাইরে) বিভিন্ন জেলায় ভর্তি হয়েছেন আরও ৫০ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ ৬৯ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া বরিশাল বিভাগে চারজন এবং খুলনা বিভাগে চারজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ ঢাকা মহানগর ও ঢাকা বিভাগের বাইরে-ভিতরে মিলিয়ে ঢাকা বিভাগে মোট ৭৬ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ১৫ হাজার ৩১০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৪ হাজার ৮৯ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এক হাজার ১৬৭ জন ডেঙ্গুরোগী।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জুলাই মাসেই ডেঙ্গুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু জুলাই মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ২০৬ জন, যা বছরের মোট আক্রান্তের বড় অংশ। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী। অন্যদিকে ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে ঝরল আরও ৩ প্রাণ, নতুন আক্রান্ত ৫৩৪
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যাওয়ায় জুলাই ও আগস্টে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সাধারণত দ্রুত বৃদ্ধি পায়। নগরাঞ্চলের পাশাপাশি এখন জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রোগী বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র এবং যেখানে পরিষ্কার পানি জমে থাকতে পারে এসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমি, তীব্র দুর্বলতা কিংবা শরীরে লালচে দাগ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো শনাক্ত ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরের তুলনামূলক চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং প্রাণ হারান ৫৭৫ জন। আর দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি দেখা যায় ২০২৩ সালে, যখন তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়।
ওই অভিজ্ঞতার আলোকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষার বাকি সময়জুড়ে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদার এবং মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে চলতি বছরও ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








