নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২২:১৩, ১৪ আগস্ট ২০২৬

ত্রিমুখী সংকটে পিষ্ট রাজধানীবাসী, দুর্বিষহ নগরজীবন

ত্রিমুখী সংকটে পিষ্ট রাজধানীবাসী, দুর্বিষহ নগরজীবন

ছবি: নিউজবাংলাদেশ (এআই)

গ্যাসের তীব্র সংকটের মধ্যেই বিদ্যুতের লোডশেডিং এবং রাজধানীর সড়কে অসহনীয় যানজট তিন সংকটের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চরম দুর্বিষহ দিন পার করছেন রাজধানীবাসী। গত কয়েক দিন ধরে চলা এই বহুমুখী সংকটের কারণে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। 

দিনের বিভিন্ন সময়ে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক বাসাবাড়িতে রান্না করা যাচ্ছে না। কোথাও আবার পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক বা লাকড়ির চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর মধ্যে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় বিকল্প ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে কাজে আসছে না। 

বাসাবাড়িতে রান্নার কাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি এবং এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া অসহনীয় লোডশেডিং নগরবাসীর স্বাভাবিক ছন্দকে সম্পূর্ণরূপে ওলটপালট করে দিয়েছে। অন্যদিকে বৃষ্টি, সড়ক উন্নয়নকাজ, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিসহ নানা কারণে যানজটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটি এবং বৈরী আবহাওয়ার জেরে দেশজুড়ে গ্যাসের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যেখানে দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ নেমে এসেছে দুই হাজার ৯৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির অধীন এলাকায় চাহিদা এক হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি হলেও মিলছে মাত্র ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

রাজধানীর শান্তিনগর, বনশ্রী, বাড্ডা, উত্তরা, মিরপুর, রামপুরা, মালিবাগ ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে দিনের বেশিরভাগ সময় চুলা জ্বলছে না। বাধ্য হয়ে নিম্ন আয়ের মানুষ লাকড়ির চুলা ব্যবহার করছেন এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ইলেকট্রিক চুলা বা রাইস কুকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। 

আরও পড়ুন: ঢাকায় নির্দিষ্ট অঞ্চলে চলবে অটোরিকশা, লাইসেন্সে কড়াকড়ি

তবে সিএনজি চালকদের দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। হাজিপাড়া, রামপুরা, তেজগাঁও ও মহাখালীসহ বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের আশায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক পাম্পে মাত্র ১৭৯ থেকে ২০০ টাকার গ্যাস পেতে চালকদের ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।

এদিকে কিছুটা স্বস্তির খবর জানিয়েছে সামিট এলএনজি টার্মিনাল। শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা জানায়, সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে তা বাড়িয়ে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা হবে। 

জ্বালানি সংশ্লিষ্টদের আশা, এর মাধ্যমে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের প্রাপ্যতা কিছুটা বাড়বে এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যে রাজধানীর ঘাটতি পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।

গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া বা লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পিক আউটে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ উধাও হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা ও কর্মজীবীরা। 

ডেসকো এবং ডিপিডিসির তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে। ভ্যাপসা গরমের মধ্যে এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট কেবল রাজধানীতেই নয়, বরং গ্রামাঞ্চলগুলোতেও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। গ্রামাঞ্চলের ছোট ছোট কারখানাগুলো বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের ত্রিমুখী সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ ট্রাফিক জাম। গত কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নকাজের কারণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। 

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মানিক মিয়া এভিনিউসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে যাওয়া এবং প্রধান সড়কের ওপর স্টেজ তৈরি করে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রগতি সরণিতে মেট্রোরেল ও ইউটিলিটি শিফটিং এবং ধানমন্ডিতে ওয়াসার উন্নয়নকাজ সড়কগুলোকে সংকুচিত করে ফেলায় নগরবাসীর যাতায়াত আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে সুনির্দিষ্ট কারণসহ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের কথা বলা হচ্ছে। 

জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা, নতুন করে দেড়শ কূপ খনন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান এই আকস্মিক সংকট কাটিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার জন্য নগরবাসী এখন কার্যকর ও দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়