নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৪৯, ১১ আগস্ট ২০২৬

‘জ্বালানি তেলে বেসরকারি বিনিয়োগ জরুরি’

‘জ্বালানি তেলে বেসরকারি বিনিয়োগ জরুরি’

ফাইল ছবি

দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে একটি সাধারণ নীতিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়, বরং যোগ্য সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রির সুযোগ দেওয়াই এ উদ্যোগের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। 

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক সেমিনারে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলের পাশাপাশি যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ভবিষ্যতে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রির সুযোগ পেতে পারে। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এতে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, ভোক্তার সামনে বিকল্প তৈরি হবে এবং একই সঙ্গে সংকটের সময়ে সরবরাহব্যবস্থার ওপর একক নির্ভরতা কমবে।

জ্বালানি তেলের ব্যবসায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার যুক্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের সময়কার অভিজ্ঞতাকে বিশেষভাবে সামনে আনেন। 

তার বক্তব্য, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকার পরও সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে অস্বাভাবিক ভিড় ও দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছিল। কোথাও কোথাও সরবরাহ সাময়িকভাবে কমে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে কালোবাজারির অভিযোগও ওঠে। এমনকি অনলাইনে বেশি দামে জ্বালানি তেল বিক্রির প্রস্তাব ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও নজরে আসে। মন্ত্রী জানান, ঢাকায় তার বাসার কাছের পেট্রোল পাম্পেও রাতভর মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখেছেন তিনি। অথচ শেষ পর্যন্ত দেশের জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে যায়নি এবং সরকার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও বিকেন্দ্রীভূত ও স্থিতিস্থাপক করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। 

এর আগে মার্চে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের মধ্যে সরকার জানিয়েছিল, দেশে প্রায় এক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং নির্ধারিত এলএনজি কার্গোগুলোর বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অতিক্রম করে দেশে আসছিল।

মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে কিছু পেট্রোলিয়াম পণ্য বেসরকারি খাত থেকে কেনার যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, সেটিকে আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত নীতিমালা কার্যকর হলে একই এলাকায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির পাম্পের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাম্পও থাকতে পারে এবং ভোক্তা নিজের পছন্দ অনুযায়ী সেখান থেকে জ্বালানি কিনতে পারবেন। সরকারি ব্যবস্থায় কোনো পণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়া গেলে ক্রেতা সেখানে যাবেন, আবার কেউ যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভিন্ন সেবা বা সুবিধার বিনিময়ে বেশি দামে কিনতে চান, সেই সুযোগও বাজারে থাকতে পারে এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর কথা তুলে ধরেন তিনি। ভারতের জ্বালানি বাজারের উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, সেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অয়েলের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জ্বালানি তেল বিপণন করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব বজায় রেখেই বেসরকারি বিনিয়োগকে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। 

একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, এ উদ্যোগের পেছনে কোনো একটি কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্য নেই।

আরও পড়ুন: ৬১৯ কোটি টাকায় ফিরছে ৩ পাটকল

জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রির সুযোগ বেসরকারি খাতে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও অভিযোগ তৈরি হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে সরকার নীতিমালা করছে এমন অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে যে অসংগতি বা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা মূলত ভুল বোঝাবুঝির কারণে। নিজের বিরুদ্ধে এ উদ্যোগের বিনিময়ে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছেন বলেও জানান তিনি এবং এসব অভিযোগকে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেন। 

একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও সমালোচনার অধিকার স্বীকার করলেও জ্বালানি সংকটকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি তৈরি করা জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

মন্ত্রীর মতে, জ্বালানি খাতের মতো কৌশলগত খাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদেরও দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি, কারণ দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা শুধু সরকারি বিনিয়োগ দিয়ে পূরণ করা কঠিন।

তবে সরকারের জ্বালানি পরিকল্পনা শুধু জ্বালানি তেলের বাজারে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। গ্যাস, কয়লা, পেট্রোলিয়াম এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতেও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেছেন মন্ত্রী। শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে সেমিনারে। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও দাতা সংস্থাগুলোর আপত্তির বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, এ ধরনের প্রকল্পে সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। 

অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎকে ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগযোগ্য খাতে পরিণত করতে সরকার দ্রুত নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে। চলতি বছরের জুনে সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে বেসরকারি বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছিল সরকার।

সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, আগামী সাড়ে চার বছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ভূমিভিত্তিক ও ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে আসতে পারে। বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে রুফটপ সোলার দ্রুত সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সিটি করপোরেশনগুলো সম্ভাবনাময় ভবন চিহ্নিত করবে, বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা সেখানে অর্থায়ন করবেন এবং নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকবে। প্রয়োজনে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে উৎসাহ দিতে হোল্ডিং ট্যাক্স-সংক্রান্ত প্রণোদনার কথাও বিবেচনা করা হতে পারে। সরকারি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য ইতোমধ্যে নির্ধারিত রয়েছে। বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৭৮১ দশমিক ০৯ মেগাওয়াট বলে সংসদে জানানো হয়েছিল।

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ বর্তমানে গ্যাস খাতে। প্রতিমন্ত্রী অমিত জানান, দেশে চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়েও এ ঘাটতি পূরণ করা যাচ্ছে না। তার মতে, দেশে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে কমছে প্রতি বছর প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট করে উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ফলে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই রাতারাতি এলএনজি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়; প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সক্ষমতাও থাকতে হবে। এ বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মহেশখালীর একটি এফএসআরইউতে সাম্প্রতিক কারিগরি বিপর্যয়ের পর। জুলাইয়ে একটি এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায় বলে বিভিন্ন সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।

এফএসআরইউ সংকটের প্রভাব শুধু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নগরজীবনেও এর প্রভাব পড়ে। জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি এবং আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার কাজে ভোগান্তির কথা উঠে আসে। কোথাও কোথাও শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি এবং রপ্তানি ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়। জ্বালানি খাতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এ ঘটনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। সরকার বর্তমানে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে একটি ভূমিভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। 

প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন এফএসআরইউ স্থাপনে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগলেও সরকার দুই বছরের কম সময়ে নতুন একটি টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য নিয়েছে। একই সঙ্গে তৃতীয় ও চতুর্থ এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। মাতারবাড়ীর ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনালকে দীর্ঘমেয়াদি আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এর জন্য জমিও চিহ্নিত করা হয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনায় একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পাচ্ছে। সমুদ্রভিত্তিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র প্রক্রিয়া সফল করার পাশাপাশি স্থলভিত্তিক অনুসন্ধানের প্রস্তুতিও চলছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়াতে বাপেক্সকে প্রযুক্তি, সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবলের দিক থেকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশেষায়িত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ছয় মাস থেকে দুই বছর মেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্সে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে কুমিল্লার শ্রীকাইল-৫ কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ৮ মিলিয়ন ঘনফুট নতুন গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার তথ্যও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, যা দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ। এলপিজি বাজারেও সরকারের সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। 

প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজির দাম নির্ধারণ করলেও অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তারা নির্ধারিত দামে পণ্য পাচ্ছেন না। বাজারে একাধিক অপারেটর থাকলেও বাস্তবে অল্প কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার নিজেই এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি খাতের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে তা বাজারে বিতরণের পরিকল্পনা করছে। সরকারের উপস্থিতি বাড়িয়ে বাজারে সরবরাহ ও দামের স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। এ পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে গ্যাসের ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে এলপিজির ওপর বাড়তে থাকা নির্ভরতা। এর আগে এলপিজি আমদানিকারকদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ ২৭০ দিনের সরবরাহকারী বা ক্রেতা ঋণ সুবিধার সুযোগও দিয়েছিল, যা আমদানি অর্থায়ন সহজ করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা এখনো সরকারের অন্যতম তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় টার্মিনালটির আংশিক কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে এবং একটি বয়লার বর্তমানে সচল রয়েছে। তবে দ্বিতীয় বয়লারটি মেরামত করে চালু করতে গেলে প্রথম বয়লারটিও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। এ কারণে অন্তত ৭২ ঘণ্টার এমন একটি সময় বেছে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, যখন দেশের ভোক্তা ও শিল্পের ওপর প্রভাব তুলনামূলক কম হবে। জুলাইয়ে এফএসআরইউ বিকলের পর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে এবং সংকট মোকাবিলায় সরকার বিদেশি সহায়তাও চেয়েছে।

সব মিলিয়ে সরকারের বর্তমান জ্বালানি পরিকল্পনায় তিনটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে সরবরাহব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস ও জ্বালানি অনুসন্ধান জোরদার করা এবং সৌরসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানো। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবটি কার্যকর হলে দেশের প্রচলিত বাজার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এর বাস্তব ফল নির্ভর করবে লাইসেন্স, আমদানি অনুমোদন, মূল্য নির্ধারণ, মজুত ও পরিবহন অবকাঠামো, মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার বিধান কতটা স্বচ্ছভাবে নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় তার ওপর। একইভাবে গ্যাস খাতে নতুন এফএসআরইউ ও ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল, দেশীয় অনুসন্ধান এবং বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সেটিও জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি ও শিল্পায়নের চাহিদা পূরণে এখন আর শুধু জ্বালানি আমদানি বাড়ানো যথেষ্ট নয়; উৎপাদন, আমদানি, মজুত, অবকাঠামো ও বিতরণ প্রতিটি স্তরে সক্ষমতা বাড়িয়ে একটি বহুমুখী ও স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়