মহাসচিব পদে ফখরুলের সম্ভাব্য বিদায়ে আলোচনায় রিজভী
ফাইল ছবি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বের সম্ভাব্য রদবদল। দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের পরবর্তী, অর্থাৎ ২৩তম রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে এমন আলোচনা গত কয়েক মাস ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে। সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
একই সঙ্গে মির্জা ফখরুল বঙ্গভবনে গেলে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব কে নেবেন, তা নিয়েও দলটির অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ। সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আহমেদের নাম।
তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন কিংবা বিএনপির নতুন মহাসচিব হিসেবে রিজভীর দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে এমন অবস্থানই সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হচ্ছে।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মহাসচিব নিজেও বলেছেন, দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রিজভীও মহাসচিব পদ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা অস্বীকার করে জানিয়েছেন, দল তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটি বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের নীতিনির্ধারকেরাই ঠিক করবেন।
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করার আলোচনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপির সরকার গঠন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলোতে কারা আসবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা শুরু হয়। ফেব্রুয়ারিতেও মির্জা ফখরুলের নাম রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনার শীর্ষে ছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেই বিএনপির মহাসচিব পদে দীর্ঘদিন থাকার পর অবসরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন।
এপ্রিলের এক বক্তব্যে তিনি বলেন, পরবর্তী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হবে, এরপর রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এ ধরনের প্রত্যাশা তার কখনো ছিল না এবং তিনি যে অবস্থানে এসেছেন, তা মূলত দায়িত্ব ও সময়ের ধারাবাহিকতায় এসেছে। জুলাইয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও জোর আলোচনা শুরু হলে মির্জা ফখরুলের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নামগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বিএনপির দ্বিতীয় শীর্ষ সাংগঠনিক পদ মহাসচিব নিয়ে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রুহুল কবির রিজভীকে এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখছেন বিএনপির একাধিক পর্যায়ের নেতা। দলীয় সূত্র ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের আলোচনায় রিজভীর নাম এগিয়ে থাকার পেছনে কয়েকটি কারণ সামনে আসছে। দীর্ঘ সময় ধরে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় থাকা, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব, নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে দলের অবস্থান তুলে ধরা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটে সংগঠনকে সক্রিয় রাখার অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রিজভীর রাজনৈতিক পরিচয়ের বড় অংশই গড়ে উঠেছে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ছাত্ররাজনীতি দিয়ে পথচলা শুরু করে তিনি পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ওঠেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি রাকসুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বও পান।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এরপর থেকে দলীয় মুখপাত্র হিসেবে সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সাংগঠনিক যোগাযোগে তাকে নিয়মিত সক্রিয় দেখা গেছে।
বিশেষ করে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময়ে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রিজভীর অবস্থান দলীয় রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব পায়। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেকে গ্রেফতার বা আত্মগোপনে থাকাকালে তিনি দলীয় কার্যালয় থেকে নিয়মিত কর্মসূচি পরিচালনা, সংবাদ সম্মেলন এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ২০১৮ সালের পর দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তার সাংগঠনিক নিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে সেখানে প্রবেশের ঘটনাতেও তিনি নেতৃত্ব দেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি। এসব কারণে বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশের কাছে রিজভী দীর্ঘদিনের পরিচিত এবং সংকটকালের সংগঠক হিসেবে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায়, বললেন আমি কিছু জানি না
তবে রিজভীর সম্ভাব্য মহাসচিব হওয়া নিয়ে আলোচনা শুধু সাংগঠনিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করছে না; তার বর্তমান রাজনৈতিক দায়িত্বও বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সরকার গঠনের পর তিনি মন্ত্রিসভায় স্থান না পেলেও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে দলীয় সংগঠন ও সরকারের রাজনৈতিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে মহাসচিবের দায়িত্বটি আগের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এমন ধারণা রয়েছে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়, মাঠপর্যায়ের সংগঠন পরিচালনা, কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় মহাসচিবকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হতে পারে। এই বাস্তবতায় দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও তৃণমূল যোগাযোগের কারণে রিজভীকে উপযুক্ত মনে করছেন দলের অনেক নেতা।
তবে সম্ভাব্য মহাসচিবের তালিকা একেবারে একক নয়। সরকার গঠনের আগের আলোচনা এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমীকরণে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামও গুরুত্ব পেয়েছিল। দলের জ্যেষ্ঠ এই দুই নেতা বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় তাঁদের সরকারি কর্মকাণ্ডের ব্যস্ততাও বিবেচনায় আসছে। অন্যদিকে রিজভী সরাসরি দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয়। ফলে সাম্প্রতিক আলোচনায় তার নামই বেশি জোরালো হয়ে উঠেছে। কিন্তু এ ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ শেষ পর্যন্ত বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
মহাসচিব পদ নিয়ে চলমান আলোচনা সম্পর্কে রুহুল কবির রিজভী নিজেও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
তার ভাষ্য, মহাসচিব পদ নিয়ে কী হচ্ছে, তা তার জানা নেই; তিনি দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রকাশ করেই দায়িত্ব পালন করছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি দীর্ঘদিন নেতা-কর্মীদের পাশে ছিলেন এবং এখনো সেই ভূমিকা পালন করছেন। দল তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটি দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নীতিনির্ধারকেরাই ঠিক করবেন। ফলে ব্যক্তিগতভাবে মহাসচিব পদে আগ্রহ প্রকাশ না করলেও তার বক্তব্যে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি স্পষ্ট।
রিজভীর নাম মহাসচিব হিসেবে সামনে আসার সময়েই তার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার আয়োজিত নির্বাচন ও রাজনৈতিক সহিংসতা বিষয়ক আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল রাজনৈতিক দল ও নেতা-কর্মীদের মানসিকতার পরিবর্তন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক ভাষার সংযত ব্যবহার।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে শুধু আইন-কানুন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। সরকার ও বিরোধী দল উভয় পক্ষের রাজনৈতিক বক্তব্যে ভাষা, শব্দ ও বাক্যবিন্যাসে সতর্কতা থাকলে নেতা-কর্মীদের মধ্যে সহিংস মনোভাব কমানো সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নির্বাচন প্রসঙ্গে রিজভীর বক্তব্যও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
তার মতে, শতভাগ সংঘাতহীন নির্বাচন বাস্তবে সম্ভব নয়; এমনকি ভারতেও নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ ওঠে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অতীতের তুলনায় ভালো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার বক্তব্যে নির্বাচনকে ঘিরে সংঘাত ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতা স্বীকার করার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বিরোধী দলের সরকারের তীব্র ও কঠোর সমালোচনার অধিকার স্বীকার করলেও সেই সমালোচনা গঠনমূলক, পারস্পরিকভাবে উপকারী এবং ভবিষ্যৎমুখী হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, রাজনৈতিক বক্তব্যে উল্টে দেব, পাল্টে দেব কিংবা যেকোনো মূল্যে ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক রেটোরিক মাঠের কর্মীদের মধ্যে সহিংসতার মানসিকতা তৈরি করতে পারে।
এই আলোচনায় রিজভী নিজের দলের সাম্প্রতিক সাংগঠনিক ব্যবস্থাকেও ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরেন।
তার দাবি, ৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বেশ কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে বহিষ্কার, অব্যাহতি, শোকজসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অতীতে বিরোধী দলের কার্যালয় ভাঙচুর বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করার ঘটনায় যারা প্রশ্রয় পেতেন, তাদের বিরুদ্ধে এবার দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এটিকে তিনি বিএনপির সাংগঠনিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার বক্তব্যের সারকথা ছিল, একটি রাজনৈতিক দল নিজের নেতা-কর্মীদের অনিয়মের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে পারলে সেটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষণ।
গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে রিজভীর বক্তব্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি বলেন, বিচারক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা কোনো কোনো উন্নত দেশেও থাকতে পারে; কিন্তু বিচারকের আসনে বসার পর বিচারিক দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা বজায় রাখা জরুরি। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতায় এজলাস থেকে হুমকি দেওয়া কিংবা বিচারিক অবস্থানকে রাজনৈতিক চেতনা প্রচারের কাজে ব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছে, তার পুনরাবৃত্তি তিনি চান না। সুবিবেচনাপ্রসূত রায় দিতে সক্ষম এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ব্যক্তিদের বিচারকের দায়িত্বে আসা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রিজভীর এই বক্তব্যের সঙ্গে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার একটি যোগসূত্রও রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতিতে থাকার কারণে তিনি গ্রেফতার, মামলা, কারাবাস ও রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হয়েছেন। বিএনপির অভ্যন্তরে তার সমর্থকেরা মনে করেন, দলের দুঃসময়ে তিনি মাঠে ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় সংগঠনের সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগ ধরে রেখেছিলেন। এ কারণেই তাকে কেবল রাজনৈতিক বক্তা নয়, বরং দীর্ঘদিনের মাঠসংগঠক হিসেবেও মূল্যায়ন করা হয়। তার সমর্থকদের আরেকটি যুক্তি হলো, দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কেন্দ্রিক রাজনীতির পাশাপাশি তিনি দেশের বিভিন্ন জেলার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার কারণে বিএনপির সাংগঠনিক বাস্তবতা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা রাখেন।
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক ভূমিকা অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ছাত্ররাজনীতির উত্তাল সময় থেকে শুরু করে বিএনপির দীর্ঘ বিরোধী রাজনৈতিক পর্বে তিনি ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আহত ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে এক-এগারোর পরবর্তী সময়, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনকাল এবং ২০২৩-২৪ সালের আন্দোলন বিভিন্ন পর্যায়ে তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা বিএনপির সাংগঠনিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ২০১৬ সালের কাউন্সিলের পর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নিয়মিতভাবে দলীয় মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করেছেন। এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতাই বর্তমানে মহাসচিব পদে তার সম্ভাব্যতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়েও সোমবারের বক্তব্যে রিজভী একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন।
তিনি দাবি করেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি কোনো নির্বাচনী সংঘাতের কারণে নিহত হননি; বরং তার ভাষায়, তিনি ভারত থেকে পরিচালিত ফ্যাসিবাদী চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। হাদির ওপর হামলার পর থেকেই রিজভী ঘটনাটিকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হাদির ওপর হামলার পর তিনি বলেছিলেন, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয় এবং বিএনপির ওপর দায় চাপানোর জন্য পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হতে পারে। পরবর্তী সময়ে হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। হাদির ওপর হামলার সময় বিএনপির পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে নির্বাচনী পরিবেশ বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছিল। ফলে সোমবারের বক্তব্যটি হাদি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে রিজভীর আগের রাজনৈতিক অবস্থানেরই আরও কঠোর সংস্করণ হিসেবে দেখা যায়।
অন্যদিকে নির্বাচন ও রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যও দেখাচ্ছে, ২০২৬ সালে রাজনৈতিক সহিংসতা এখনো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির জানুয়ারি-জুনের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে প্রথম ছয় মাসে ৫৬ জন রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত এবং ৫ হাজার ২৪৬ জন আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ২৬১টি মব সহিংসতার ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর আগে জানুয়ারি-মার্চের প্রথম তিন মাসে রাজনৈতিক ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ৩৬ জন নিহত এবং চার হাজারের বেশি আহত হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে রিজভীর রাজনৈতিক সহিংসতা কমাতে ভাষা, আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়ার বক্তব্যটি এমন একটি সময় এসেছে, যখন রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগও অব্যাহত রয়েছে।
নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়েও মূল্যায়ন একরৈখিক নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে মূল্যায়ন করলেও প্রচারণার ব্যয়সীমা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ নির্বাচন নিয়ে রিজভীর অতীতের তুলনায় ভালো মূল্যায়নের পাশাপাশি নাগরিক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের বিভিন্ন উদ্বেগও রয়েছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যেই বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বকে আগামী দিনে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হওয়া এবং তার জায়গায় রুহুল কবির রিজভীর সম্ভাব্য মহাসচিব হওয়ার আলোচনা এখন বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে দীর্ঘদিনের মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুলের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও দলীয় নেতৃত্বে ভূমিকা তাকে রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় এগিয়ে রাখছে; অন্যদিকে রিজভীর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কেন্দ্রীয় সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংকটকালে দলের মুখপাত্র হিসেবে সক্রিয়তা তাকে মহাসচিব পদে সম্ভাব্য উত্তরসূরির আলোচনায় এগিয়ে দিয়েছে। তবে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় শেষ পর্যন্ত কী পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, দলের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত এবং বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক কৌশলের ওপর। আপাতত যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য বঙ্গভবন যাত্রার আলোচনা যত জোরালো হচ্ছে, ততই বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে রুহুল কবির রিজভীর নামটি রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে; কিন্তু সেই আলোচনা এখনো সিদ্ধান্তে রূপ নেয়নি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








