ধর্ম ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:৫৮, ২৪ আগস্ট ২০২৬

দাম্পত্য জীবনে বিরোধ মেটাতে যে পরামর্শ দিয়েছেন মুহাম্মদ (সা.)

দাম্পত্য জীবনে বিরোধ মেটাতে যে পরামর্শ দিয়েছেন মুহাম্মদ (সা.)

প্রতীকী ছবি

দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ অস্বাভাবিক নয়। দুজন মানুষ একসঙ্গে থাকলে মতের পার্থক্য থাকবেই। পছন্দ, অভ্যাস কিংবা কোনো বিষয় নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিতেও ভিন্নতা থাকতে পারে।

সমস্যা মতবিরোধে নয়; বরং মতবিরোধের সময় আমরা কীভাবে আচরণ করি, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরেও মানবিক অনুভূতি ছিল। কখনো অভিমান হয়েছে, মন খারাপ হয়েছে, এমনকি স্ত্রীদের মধ্যে ঈর্ষার প্রকাশও ঘটেছে। তবে এসব পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে তার আচরণ ছিল ভারসাম্যপূর্ণ, কোমল ও দূরদর্শী।

১. রাগের সময় অপমান করতেন না
দাম্পত্য জীবনের বড় ক্ষত অনেক সময় কথার মাধ্যমে তৈরি হয়। রাগের মুহূর্তে মানুষ এমন কথা বলে ফেলে, যা পরে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিন গালাগালকারী নয়, অভিশাপকারী নয়, অশ্লীলভাষীও নয়। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭)

স্বামী-স্ত্রীর মতবিরোধেও এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মতবিরোধ হতে পারে, কিন্তু অপমান, গালাগালি বা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়।

২. স্ত্রীর অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতেন
একবার আয়েশা (রা.)-এর কাছে রাসুলুল্লাহ (সা.) জানতে চাইলেন, তিনি তাঁর ওপর সন্তুষ্ট কি না। আয়েশা (রা.) বললেন, কীভাবে তিনি তা বুঝতে পারেন?

রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আয়েশা (রা.) সন্তুষ্ট থাকলে বলেন, মুহাম্মদের রবের কসম। আর অসন্তুষ্ট থাকলে বলেন, ইবরাহিমের রবের কসম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৮)

এখানে দাম্পত্য সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে- সঙ্গীর অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা। সব কথা মুখে বলতে হয় না; আচরণেও অনেক অনুভূতি প্রকাশ পায়।

৩. স্ত্রীর অভিমানকে উপহাস করতেন না
আয়েশা (রা.)-এর মধ্যে স্বাভাবিক মানবিক ঈর্ষা ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তা বুঝতেন এবং পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতেন না।

একবার তাঁর অন্য একজন স্ত্রী খাবারের পাত্র পাঠালে আয়েশা (রা.) ঈর্ষাবশত পাত্রটি ভেঙে ফেলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের মা ঈর্ষা করেছেন।

এরপর তিনি ভাঙা পাত্রের ক্ষতিপূরণ করেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবে সামলান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৫)

এ ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, প্রতিটি আবেগকে অপরাধ হিসেবে দেখলে সম্পর্ক আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কখনো সঙ্গীর অনুভূতি বুঝতে হয় এবং শান্তভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হয়।

৪. দাম্পত্যের ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করতেন না
স্বামী-স্ত্রীর অনেক সমস্যাই ব্যক্তিগত। এসব বিষয় বন্ধু, আত্মীয়স্বজন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে সমস্যা আরও বড় হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মর্যাদার মানুষ হলো সে ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর কাছে যায় এবং স্ত্রীও তার কাছে আসে, তারপর সে তার স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৩৭)

এই হাদিস স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখার গুরুত্ব স্পষ্ট করে।

৫. প্রয়োজন হলে সময় নিতেন
সব মতবিরোধের তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন হয় না। কখনো পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য সময় নেওয়াও প্রয়োজন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তার স্ত্রীদের একটি ঘটনায় এক মাস তাদের থেকে পৃথক ছিলেন। এ সময় তিনি কোনো অশোভন আচরণ করেননি; বরং পরিস্থিতি সামাল দিতে সময় নিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০১)

রাগের সময় অতিরিক্ত কথা না বলা, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং প্রয়োজনে কিছুটা সময় নেওয়া সম্পর্ক রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।

৬. স্ত্রীর পরামর্শকে গুরুত্ব দিতেন
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের মতামত ও পরামর্শকে গুরুত্ব দিতেন। হুদাইবিয়ার সময় সাহাবিরা চুক্তির পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে মানসিকভাবে দ্বিধায় ছিলেন। তখন উম্মে সালামা (রা.) তাকে পরামর্শ দেন, তিনি যেন নিজে কোরবানি করেন এবং মাথা মুণ্ডন করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার পরামর্শ গ্রহণ করেন। এরপর সাহাবিরাও তাকে অনুসরণ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩১–২৭৩২)

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, স্ত্রীকে শুধু আবেগের মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। তার বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শেরও মূল্য রয়েছে।

আরও পড়ুন: জুমার দিন আগে মসজিদে যাওয়ার বিশেষ ফজিলত

৭. ছোট ছোট যত্নে ভালোবাসা প্রকাশ করতেন
দাম্পত্যে মতবিরোধ থাকলেও ভালোবাসা ও আন্তরিকতা হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তার পান করা পাত্রের একই জায়গা থেকে পান করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০)

এ ধরনের ছোট ছোট আচরণ দাম্পত্যে গভীর আপনত্ব তৈরি করে। সম্পর্ক সবসময় বড় উপহার দিয়ে টিকে থাকে না; অনেক সময় ছোট ছোট যত্নই সম্পর্ককে সুন্দর ও দৃঢ় রাখে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)

এটি দাম্পত্য জীবনের একটি মৌলিক শিক্ষা। একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্র ঘরের মানুষই সবচেয়ে ভালোভাবে জানে। বাইরে ভদ্রতা দেখিয়ে ঘরে রূঢ় আচরণ করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ নয়।

দাম্পত্য জীবনে মতপার্থক্য থাকবেই। তবে মতবিরোধ যেন অপমান, গালাগালি, প্রতিশোধ কিংবা সম্পর্ক ভাঙনের কারণ না হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা হলো- ভালোবাসা, ধৈর্য, সংযম, পারস্পরিক সম্মান এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে মতবিরোধও সুন্দরভাবে সামলানো সম্ভব।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়