News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৩৯, ২৬ মে ২০২৬

জঙ্গল সলিমপুরে হামলার জবাবে কঠোর হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

জঙ্গল সলিমপুরে হামলার জবাবে কঠোর হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের সংঘটিত অত্যন্ত দুঃসাহসিক ও বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, সন্ত্রাসীদের এই চরম ধৃষ্টতা ও আইন অমান্য করার দুঃসাহসের উপযুক্ত এবং কঠোর জবাব দেওয়া হবে। 

মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরের সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে এক দীর্ঘ ও বিস্তারিত মতবিনিময় সভায় তিনি সরকারের এই দৃঢ় অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেন। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে দেশে আইনের শাসন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকায় জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি অপরাধীদের অন্যতম নিরাপদ আশ্রয়স্থল তথা ‘সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য’ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। তবে বর্তমান প্রশাসন সেখানে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করবে না এবং অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হবে।

সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও র‍্যাবের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, গত রোববার দিবাগত গভীর রাতে জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রায় দুই থেকে তিনশত সশস্ত্র সন্ত্রাসী অতর্কিতভাবে র‍্যাব ও পুলিশের একটি যৌথ অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলা চালায়। হামলাকারীরা ভারী এক্সকাভেটর (খননযন্ত্র) ব্যবহার করে নির্মাণাধীন নতুন অস্থায়ী ক্যাম্পটি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের যাতায়াত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত অভিযানে বাধা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তারা ওই অঞ্চলের সংযোগ সড়কগুলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। 

উল্লেখ্য যে, আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের স্বশরীরে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে যাওয়ার একটি পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি রয়েছে। সন্ত্রাসীদের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত এই নতুন অস্থায়ী ক্যাম্পটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজেই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করার কথা ছিল। এই হামলার ঘটনা মূলত সরকারের উন্নয়ন ও উচ্ছেদ অভিযানকে বাধাগ্রস্ত করার একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা বলে মনে করছে প্রশাসন।

এর আগে, গত ৯ মার্চ অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে কুখ্যাত এই জঙ্গল সলিমপুর অঞ্চলকে সন্ত্রাসমুক্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ এবং বিজিবির (বিজিবি) প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের সমন্বয়ে একটি বিশাল ও ঐতিহাসিক যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। ওই ব্যাপক অভিযানের পরই মূলত এই দীর্ঘদিনের দুর্গম অপরাধপ্রবণ এলাকাটি স্থায়ীভাবে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সেখানে স্থায়ী আইন প্রয়োগকারী চৌকি বা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সেই সফল অভিযানের পর এই নতুন হামলা মূলত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, জঙ্গল সলিমপুরকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী ও স্থায়ী মহাপরিকল্পনা রয়েছে। 

তিনি বলেন, “আমি এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটি কৌশলগত কারণে প্রকাশ করতে চাই না, তবে এটুকু নিশ্চিত করছি যে ওই দুর্গম অঞ্চলে অপরাধীদের স্থায়ীভাবে দমন এবং পুনর্বাসন ঠেকাতে সেখানে বাংলাদেশ পুলিশের একটি অত্যাধুনিক ট্রেনিং সেন্টার এবং একটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বিশাল জেলাখানা বা কারাগার প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।” এই স্থায়ী অবকাঠামোগুলো নির্মিত হলে ওই এলাকায় অপরাধীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকবে না এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি বজায় থাকবে। 

মন্ত্রী আরও আশ্বস্ত করেন যে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবেই এবং কোনো সন্ত্রাসী বা অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্য এ দেশে আর থাকতে দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে চলমান উত্তেজনা এবং বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের নাগরিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, সীমান্তে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও জাতীয়ভাবে বড় ধরনের কোনো উদ্বেগ বা দেশ অস্থিতিশীল হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। 

আরও পড়ুন: বুলডোজার ও একে-৪৭ নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে ক্যাম্পে ৩০০ সন্ত্রাসীর হামলা

তিনি জানান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একটি সার্বক্ষণিক প্রক্রিয়া এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা হচ্ছে। 

সম্প্রতি সীমান্তে যেসব জায়গায় পাল্টা গুলির ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোকে মন্ত্রী ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, সীমান্তে এমন কিছু ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটে থাকে, যা আমাদের বিজিবির মহাপরিচালক (ডিজি) এবং স্থানীয় কর্মকর্তারা অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাড্রেস করেছেন এবং যথাযথ জবাব দিয়েছেন। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবি সর্বদা তৎপর রয়েছে।

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। 

মাদকের সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশের কেউ যদি মাদক ব্যবসায় সরাসরি জড়িত থাকে বা কোনো মাদক কারবারিকে পর্দার আড়াল থেকে সহযোগিতা করে, তবে তাকে কোনো প্রকার অনুকম্পা না দেখিয়ে সরাসরি চাকরিচ্যুত করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে। 

এছাড়া ঢাকার সাভারসহ দেশের যেকোনো প্রান্তে প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে মাদক ব্যবসার সুনির্দিষ্ট তথ্য বা রিপোর্ট সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রদান করা হলে, প্রশাসন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন। গত তিন মাসে দেশের জঘন্যতম অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের সময়োপযোগী ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপের নজিরও তিনি এ সময় তুলে ধরেন।

আসন্ন কোরবানি ঈদ এবং সাম্প্রতিক সাধারণ মানুষের যাতায়াত প্রসঙ্গে সন্তোষ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে এবারের ঈদযাত্রায় সাধারণ যাত্রীদের মহাসড়কে বড় ধরনের কোনো ভোগান্তি, দীর্ঘ যানজট বা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়নি। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-টাঙ্গাইলসহ দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে এবং যমুনা ও পদ্মা সেতু সার্বক্ষণিকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নিবিড় নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এছাড়া যেসব দুর্গম পয়েন্টে স্থায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা নেই, সেখানে কর্তব্যরত হাইওয়ে ও জেলা পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে ডিজিটাল তদারকি নিশ্চিত করা হচ্ছে। চালক ও যাত্রীদের সচেতনতার ফলে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার সড়ক দুর্ঘটনার হারও লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।

মহাসড়কের টোল প্লাজাগুলোতে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টিকিট কাটার কারণে সৃষ্ট দীর্ঘ যানজট নিয়ে মন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেন। 

তিনি বলেন, বর্তমানে সনাতন পদ্ধতিতে ম্যানুয়ালি টোল আদায়ের কারণে টোল প্লাজাগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। এই সমস্যার স্থায়ী ও আধুনিক সমাধানের জন্য আমরা উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা প্রবর্তনের চিন্তা করছি। বিশ্বের উন্নত দেশের মতো প্রতিটি গাড়িতে একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল কার্ড বা আরএফআইডি ট্যাগ থাকবে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল প্লাজা অতিক্রম করার সময় টাকা কেটে নেবে। এর ফলে কোনো গাড়িকে টোলের জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে না। এই বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আমি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কে বিশেষ পরামর্শ প্রদান করব।

আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পশুর হাটগুলোর নিরাপত্তা এবং জালনোটের বিস্তার রোধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন। দেশের প্রতিটি বড় পশুর হাটে পুলিশি নিরাপত্তার পাশাপাশি জালনোট শনাক্তকরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় আধুনিক মেশিন বসানো হয়েছে। একই সাথে, কোরবানির পশুর বর্জ্য যেন ঈদের দিন থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ অপসারণ করা যায়, সেজন্য দেশের সকল সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনগুলোকে বিশেষ ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশকে একটি ঐতিহ্যগত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, লোকনাথ ব্রহ্মচারীর তিরোধান উৎসবসহ দেশের সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠান পালনে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও পুলিশকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যাতে সব ধর্মাবলম্বী নাগরিক সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মচর্চা সম্পন্ন করতে পারেন। রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়