আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:৪৮, ২৯ মে ২০২৬
আপডেট: ১৮:৪৮, ২৯ মে ২০২৬

উৎক্ষেপণ মুহূর্তেই বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত ব্লু অরিজিনের নিউ গ্লেন রকেট

উৎক্ষেপণ মুহূর্তেই বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত ব্লু অরিজিনের নিউ গ্লেন রকেট

ছবি: সংগৃহীত

বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার আবহে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ধনকুবের জেফ বেজোসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘ব্লু অরিজিন’। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানোর সময় প্রতিষ্ঠানটির তৈরি ভারী ও শক্তিশালী ‘নিউ গ্লেন’ রকেটে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। 

স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সন্ধ্যায় লঞ্চপ্যাডে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। মহাকাশ প্রযুক্তির বাজারে শীর্ষস্থানে থাকা ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান ‘স্পেসএক্স’-এর সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে আনার জন্য ব্লু অরিজিন যখন জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, ঠিক তখনই এই দুর্ঘটনাটিকে জেফ বেজোসের মহাকাশ স্বপ্নের জন্য একটি বড় ধাক্কা ও চরম বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

দুর্ঘটনার সময়কার প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, পরীক্ষার একপর্যায়ে রকেটটির নিচের অংশ থেকে আচমকা ঘন ধোঁয়া বের হতে শুরু করে। এর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পুরো রকেটটি একটি বিশাল ও প্রলয়ংকরী অগ্নিগোলকে পরিণত হয় এবং তীব্র গতিতে আকাশের দিকে উড়ে যায়। এ সময় ধোঁয়া ও আগুনের একটি বিশাল কুণ্ডলী বা স্তম্ভ তৈরি হয়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়ে, যা বহুদূর থেকেও দৃশ্যমান ছিল। এই আকস্মিক বিস্ফোরণের পরপরই ফ্লোরিডার জরুরি উদ্ধারকারী দল এবং নিরাপত্তা কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, তাৎক্ষণিকভাবে চারপাশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে এবং বড় কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, ঘটনার ফলে বাতাসে কোনো বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়া বা নতুন করে কোনো পরিবেশগত বিপদের ঝুঁকি নেই। একই সঙ্গে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে কর্তব্যরত কোনো কর্মী বা উদ্ধারকারী দলের সদস্য হতাহত হননি বলে জানানো হয়েছে।

বিস্ফোরণের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক বিবৃতিতে ব্লু অরিজিন পুরো বিষয়টিকে একটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা’ বা ‘অস্বাভাবিকতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। 

আরও পড়ুন: যুদ্ধবিরতি আরও দুই মাস বাড়াতে প্রাথমিক সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

সংস্থাটি জানায়, রকেটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হটফায়ার’ পরীক্ষা চলাকালীন তারা এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হন এবং সেখানে উপস্থিত সমস্ত কর্মী সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও নিরাপদে আছেন। পরবর্তীতে ব্লু অরিজিনের প্রধান জেফ বেজোস নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন অথচ দৃঢ় বার্তা প্রকাশ করেন। 

তিনি স্বীকার করেন যে দিনটি তাদের পুরো টিমের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট বা প্রকৃত কারণ এখনো উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি জানিয়ে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, বিস্ফোরণে যা কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা তারা সম্পূর্ণ নতুন করে পুনর্নির্মাণ করবেন এবং খুব দ্রুতই আবারও উড্ডয়ন প্রক্রিয়া শুরু করবেন।

এদিকে এই স্পর্শকাতর ঘটনার পর মার্কিন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলেও তৎপরতা শুরু হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য মাইক হ্যারিডোপোলস গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং ঘটনার পরপরই মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA) শীর্ষ প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। সার্বিক পরিস্থিতি এবং এর পরবর্তী প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। 

মূলত এই ‘নিউ গ্লেন’ রকেটটিকে কেন্দ্র করে ব্লু অরিজিন ও মূল প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনের একটি বিশাল বাণিজ্যিক পরিকল্পনা রয়েছে। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে (লো আর্থ অরবিট) অ্যামাজনের নিজস্ব ইন্টারনেট প্রকল্পের অধীনে ৪৮টি কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট পাঠানোর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল এই রকেটের। এই স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কটিকে মূলত ইলন মাস্কের বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ‘স্টারলিংক’ ইন্টারনেট সেবার প্রধান ও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তোলার মাস্টারপ্ল্যান ছিল জেফ বেজোসের।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার পর প্রতিদ্বন্দ্বী মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্কও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সচরাচর তীব্র ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকলেও এই বিপর্যয়ের মুহূর্তে ব্লু অরিজিনের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে মাস্ক ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক’ বলে আখ্যায়িত করেন। একই সঙ্গে রকেট প্রযুক্তির জটিলতা ও কাঠিন্যর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি নিজের এক্সে লেখেন, ‘রকেট তৈরি করা সত্যিই অনেক কঠিন একটি কাজ।’ 

আন্তর্জাতিক মহাকাশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিস্ফোরণের ফলে নিউ গ্লেন রকেটের মূল উৎক্ষেপণ এবং অ্যামাজনের স্যাটেলাইট মিশনটি অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে, যা বাণিজ্যিক মহাকাশ প্রতিযোগিতার সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলল।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়