আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:১২, ১৩ মে ২০২৬

সীমান্ত নিরাপত্তায় আপসহীন দিল্লি

সীমান্ত নিরাপত্তায় আপসহীন দিল্লি

ফাইল ছবি

ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, অনুপ্রবেশ ইস্যু এবং তিস্তা প্রকল্প ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে গতি আনতে ভারতের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিএসএফকে প্রয়োজনীয় জমি ৪৫ দিনের মধ্যে হস্তান্তরের ঘোষণা দেন। এর পরপরই বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

নয়াদিল্লিতে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, “সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষা আমাদের অগ্রাধিকার। এই সিদ্ধান্ত আমরা সেই দৃষ্টিতেই দেখি।” তবে এই পদক্ষেপ বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে কি না সে প্রশ্নে তিনি সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে যান।

শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সোমবার। বৈঠক শেষে তিনি ঘোষণা দেন, বাংলাদেশ সীমান্তে যেসব অংশে এখনো কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ হয়নি, সেখানে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে বিএসএফকে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ২ হাজার ২১৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে, যা ভারতের যেকোনো রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘতম সীমান্ত। এই সীমান্তের প্রায় ১ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৬৯৬ কিলোমিটার অংশে ইতোমধ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মিত হলেও এখনো প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার অংশ খোলা রয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অবশিষ্ট অংশে বেড়া নির্মাণে প্রায় ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন।

ভারতের আইন অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ পুরোপুরি রাজ্য সরকারের এখতিয়ারভুক্ত। এর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের সময় সীমান্ত এলাকায় জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও স্থানীয় কৃষকদের আপত্তি, ক্ষতিপূরণ নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য টানাপোড়েন এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তা দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে। পরে বিএসএফ বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। আদালত রাজ্য সরকারকে দ্রুত জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় এসেই নতুন সরকার ৪৫ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করে সীমান্ত প্রকল্পে গতি আনার ঘোষণা দিয়েছে।

ভারতের এই অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির মন্তব্য করেন, কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশকে এখন আর ভয় দেখানোর জায়গা নেই। বাংলাদেশের মানুষ ও সরকার কাঁটাতার ভয় পায় না। তার এই বক্তব্য দুই দেশের সীমান্ত রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নয়াদিল্লির ব্রিফিংয়ে সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। এক সাংবাদিক বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রসঙ্গ তুলে জানতে চান, অবৈধভাবে ইউরোপে পাড়ি জমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ যেভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সেই নীতি ভারতের ক্ষেত্রেও সমভাবে কার্যকর হওয়া উচিত কি না। 

আরও পড়ুন: অবৈধ বাংলাদেশি ফেরত পাঠাতে ঢাকার সহযোগিতা চায় নয়াদিল্লি

প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, অনুপ্রবেশের বিষয়টি বাংলাদেশ-ভারত আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তিনি দাবি করেন, ভারতে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন বলে সন্দেহ করা ২ হাজার ৮৬০ জনের বেশি ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য অনেক আগেই ঢাকার কাছে অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। ভারতের দাবি, তারা সবাই বাংলাদেশি নাগরিক; তবে বাংলাদেশ এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

ব্রিফিংয়ে তিস্তা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চীন সফরে গিয়ে তিস্তা প্রকল্পে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চেয়েছেন বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। এর আগে এই প্রকল্পে ভারতের সম্পৃক্ততার আলোচনা থাকলেও এখন চীনের দিকে ঝোঁক দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে কি না এমন প্রশ্ন করা হলে রণধীর জয়সোয়াল সরাসরি মন্তব্য না করে বলেন, বিশ্বের যেকোনো স্থানে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ওপর ভারতের তীক্ষ্ণ নজর থাকে। এ ক্ষেত্রেও সেই নজর রয়েছে। একইসঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত সবসময় পারস্পরিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়েও বাংলাদেশে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে সাংবাদিকরা ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চাইলে জয়সোয়াল বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নিতে চায় এবং সেই নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। 

তার ভাষায়, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ভারত ইতিবাচক করে তুলতে চায়। সেই মনোভাবের বদল হয়নি।

এদিকে একই ব্রিফিংয়ে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা এবং তথাকথিত ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সময়ে পাকিস্তানকে চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, এ ধরনের প্রতিবেদন ভারতের নজরে এসেছে এবং বিষয়টি আগে থেকেই জানা ছিল। 

যদিও তিনি সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ করেননি, তবে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় বলেন, যেসব দেশ নিজেদের দায়িত্বশীল রাষ্ট্র দাবি করে, তাদের ভেবে দেখা উচিত সন্ত্রাসবাদে মদদপুষ্ট অবকাঠামোকে রক্ষার চেষ্টা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের ভাবমূর্তিতে কী প্রভাব ফেলছে।

তিনি আরও বলেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’ ছিল পহেলগামের হামলার জবাবে ভারতের “সুনির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত” সামরিক প্রতিক্রিয়া, যার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস করা। যদিও বিষয়টি সরাসরি বাংলাদেশ প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত নয়, তবে একই ব্রিফিংয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ, আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য এবং চীনের ভূমিকা নিয়ে ভারতের সামগ্রিক অবস্থান স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে নতুন গতি, অনুপ্রবেশ ইস্যুতে ভারতের চাপ, তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা রাজনীতি এসব বিষয় বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। 

যদিও দিল্লি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ককে “ইতিবাচক” বলেই তুলে ধরছে, তবু সীমান্ত, পানি বণ্টন, অনুপ্রবেশ এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যে আগামী দিনগুলোতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়