লোকজ খাদ্য থেকে বিশ্বস্বীকৃত পুষ্টির উৎস ‘পান্তাভাত’
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই আতিথেয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে যুগ যুগ ধরে মিশে আছে পান্তাভাত। সেই চিরচেনা পান্তাভাত এখন আর কেবল গ্রামীণ জনপদের সকালের নাস্তা কিংবা পহেলা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নেই। এক সময়ের ‘গরিবের খাবার’ হিসেবে পরিচিত এই পান্তা ছিল কেবল সাধারণ মানুষের ক্ষুন্নিবৃত্তির উপায়, এখন বিশ্বজুড়ে পুষ্টিবিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রে। আধুনিক বিজ্ঞান তাকেই এখন বলছে পুষ্টির খনি বা ‘সুপারফুড’।
দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে জাপান, কোরিয়া এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতেও গাজন করা বা ফারমেন্টেড ভাতের উপকারিতা নিয়ে চলছে ব্যাপক গবেষণা। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, পান্তাভাতের পুষ্টিগুণ অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত জাপানি ‘নাট্টো’ (Natto) কিংবা কোরিয়ান ‘কিমচি’কেও (Kimchi) টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সঠিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত পান্তাভাত কেবল ঐতিহ্যের অংশ নয়, বরং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি কার্যকর খাদ্য।
পান্তাভাতের রাসায়নিক গঠন নিয়ে প্রথম দীর্ঘমেয়াদী একাডেমিক গবেষণা করেন ভারতের আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। কৃষি ও জৈব প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মধুমিতা বড়ুয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণার ফল বিশ্বখ্যাত ‘এশিয়ান জার্নাল অফ কেমিস্ট্রি’-তে প্রকাশিত হয়।
বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, সাধারণ ভাতের চেয়ে নির্দিষ্ট সময় ধরে পানিতে ভিজিয়ে রাখা ভাতে খনিজ পদার্থের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, ১০০ গ্রাম সাধারণ সেদ্ধ ভাতে যেখানে আয়রনের পরিমাণ প্রায় ৩.৫ মিলিগ্রাম, সেখানে অন্তত ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা পান্তাভাতে তা বেড়ে প্রায় ৭৩.৯ মিলিগ্রামে পৌঁছায়। একইভাবে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ২১ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে প্রায় ৮৫০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত উন্নীত হতে পারে। ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, জিঙ্ক, ফসফরাস ও ভিটামিন বি-জাতীয় উপাদানও তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া যায়।
পুষ্টিবিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেন, চালের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে থাকা ‘ফাইটেট’ নামক উপাদান আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিঙ্কসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে আবদ্ধ করে রাখে। ফলে সাধারণ ভাত খাওয়ার পর শরীর সব পুষ্টি কার্যকরভাবে শোষণ করতে পারে না। কিন্তু ভাত দীর্ঘসময় পানিতে ভিজিয়ে রাখলে স্বাভাবিক গাঁজন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই গাঁজনের ফলে ফাইটেট দুর্বল হয়ে যায় এবং আবদ্ধ খনিজ উপাদান মুক্ত হয়। তখন শরীর সহজেই সেগুলো গ্রহণ করতে পারে।
গাঁজন প্রক্রিয়ার কারণে পান্তাভাতে উপকারী জীবাণুর উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডভিত্তিক খাদ্যগবেষণায় পান্তাভাতের পানিতে অন্ত্রের জন্য উপকারী জীবাণুর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে, যা হজমশক্তি উন্নত করা ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। নিয়মিত পান্তাভাত গ্রহণ রক্তে অক্সিজেন পরিবহন প্রক্রিয়া উন্নত করতে পারে- কারণ এতে থাকা আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিন গঠনে ভূমিকা রাখে। ক্যালসিয়াম হাড় মজবুত করে, ম্যাগনেসিয়াম দেহের বিভিন্ন এনজাইম সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে এবং পটাসিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অন্তত ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা হলে পান্তাভাতের পুষ্টিগুণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তবে অনেকেই পান্তা খাওয়ার আগে অতিরিক্ত ধুয়ে বা পানি ফেলে দেন। এতে পানিতে দ্রবীভূত অধিকাংশ পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়ে যায়।
গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, পান্তাভাতের পানিতেই উল্লেখযোগ্য অংশের খনিজ ও উপকারী উপাদান থাকে। তাই পান্তা প্রস্তুতের সময় অতিরিক্ত ধোয়া বা পানি ফেলে দেওয়া পুষ্টির অপচয়ের সামিল।
বাংলাদেশ ও পূর্বভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পান্তাভাত কেবল দৈনন্দিন খাবার নয়, বরং উৎসবের অংশ। পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ এখন নগরজীবনেরও জনপ্রিয় আয়োজন।
খাদ্যসংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ুগত বাস্তবতায় উষ্ণ অঞ্চলে গাঁজনজাত খাবারের প্রচলন ছিল স্বাভাবিক ও বৈজ্ঞানিক। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভাতভিত্তিক গাঁজনজাত খাদ্যের প্রচলন রয়েছে- যেমন জাপানে ফারমেন্টেড চালের প্রস্তুতি, কোরিয়ায় গাঁজনভিত্তিক খাবার, কিংবা থাইল্যান্ডে ঐতিহ্যবাহী ভাতের সংরক্ষণপদ্ধতি। এসব ক্ষেত্রেই গাঁজন প্রক্রিয়া খাদ্যের পুষ্টিমান ও হজমযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
পুষ্টিবিদরা আরও পরামর্শ দেন, পান্তাভাতের জন্য চাল নির্বাচনে সচেতন হওয়া জরুরি। অতিরিক্ত পালিশ করা সরু সাদা চালের পরিবর্তে তুলনামূলক কম প্রক্রিয়াজাত, লালচে বা দেশি ধানের চাল অধিক পুষ্টিকর। কারণ চালের বাইরের আবরণে গুরুত্বপূর্ণ আঁশ ও খনিজ উপাদান থাকে, যা অতিরিক্ত পালিশে নষ্ট হয়ে যায়।
খাদ্যের অপচয় রোধেও পান্তাভাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চাল ধোয়া জল কিংবা ভাতের মাড় সরাসরি ফেলে না দিয়ে ঠান্ডা করে গাছের জৈব তরল সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়- যা পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চার অংশ হতে পারে।
সব মিলিয়ে পান্তাভাত আর কেবল দরিদ্রের খাবার বা গ্রামীণ অভ্যাস নয়; বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে এটি এক সম্ভাবনাময় পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য। সঠিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত ও সচেতনভাবে গ্রহণ করলে পান্তাভাত হতে পারে স্বাস্থ্যরক্ষার সহজ, সাশ্রয়ী ও দেশীয় সমাধান।
পান্তাভাত শুধুই দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ খাবার নয়; এটি খাদ্যসংস্কৃতি, পুষ্টিগুণ ও গাঁজনজাত খাবারের বিশ্বব্যাপী এক উল্লেখযোগ্য উপাদান। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম অঞ্চলের লোকেরা যুগে যুগে পান্তাভাতকে দৈনন্দিন খাবার ও উৎসবের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক খাদ্যভাষ্য পন্থায় দেখা যাচ্ছে- পান্তাভাতের ধারণা ও অনুরূপ পদ্ধতি অনেক দেশে বিদ্যমান, ও সেগুলো পুষ্টিগত বা কার্যকর খাদ্য হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
আরও পড়ুন: প্রকৃতির গোপন নিরাময়কারী: পাথর কুচি, কালানচো পিন্নাটা
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পান্তাভাতজাতীয় খাদ্য-প্রথা
- থাইল্যান্ড: ভাত ও ‘নেওং’ খাবারের প্রচলন
থাই খাদ্যসংস্কৃতিতে ‘ন্যাও নিয়া’ বা গাঁজানো ভাতের ধারণা কার্যকরভাবে বিদ্যমান। দীর্ঘসময় ভিজিয়ে রাখা বা হালকা গাঁজানো ভাতকে থাই গ্রামীণ অঞ্চলে ঘরোয়া খাবার হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বিশেষত পূজা বা মেলা-উৎসবে এই পদ্ধতিতে প্রস্তুত ভাতকে পরিবেশ করার প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। থাই গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, পান্তাভাতের মতো দীর্ঘসময় ভিজানো ভাতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া (প্রোবায়োটিক) বৃদ্ধি পায় যা হজম ও অন্ত্র-স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক।
- জাপান: ‘ফুকুয়া’ ও গাঁজনজাত ভাতের ঐতিহ্য
জাপানে ঐতিহ্যগতভাবে ভাতকে বিভিন্ন গাঁজনজাত খাবারে রূপান্তর করে আনা হয়েছে, যেমন: মিশি (Mochi) বা খামির ভাত (Yeast Rice) ধরনের হালকা গাঁজানো ভাত। যদিও এটি সরাসরি পান্তাভাতের মতো দীর্ঘসময় পানিতে ভিজিয়ে প্রস্তুত না হলেও, ভাতের গাঁজন ও প্রোবায়োটিক বৈশিষ্ট্যগুলোর দিক থেকে আন্তর্জাতিক গবেষকরা জাপানের এই ঐতিহ্যকে পুষ্টি-সম্বন্ধীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। জাপানিজ গবেষণায় দেখা গেছে, গাঁজানো ভাতে এমন ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পায়, যা পেটের পরিবেশকে সহায়ক করে।
- কোরিয়া: পান্তাভাতের মতো গাঁজনজাত খাদ্য ‘কালগুকসু’ ও ‘কিমচি’
কোরিয়ায় গাঁজনজাত খাদ্যরীতি বিশেষভাবে উন্নত। যদিও তারা ভাতকে দীর্ঘসময় ভিজিয়ে রাখে না, তবু ভাতভিত্তিক বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় খাদ্যকে গাঁজানো হয়। কিমচির মতো খাবার দীর্ঘসময় গাঁজানো ও প্রোবায়োটিক বৃদ্ধি পায়- পুষ্টি ও হজমে কার্যকর। এই গাঁজনজাত খাদ্যগুলি বিশ্বে প্রোবায়োটিক খাদ্য হিসেবে পরিচিত।
- ইন্দোনেশিয়া: ‘নাসি উম্বুট’ ও ভিজানো ভাত-সংস্কৃতি
ইন্দোনেশিয়ার কিছু অঞ্চলে ভাতকে পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরবর্তী দিনে পুনরায় রান্না করে খাওয়া প্রচলিত বিশেষত উৎসব বা ভ্রমণকালে একের অধিকদিনের খাবার হিসেবে। যদিও এটি ‘পান্তাভাত’ শব্দের মতো নাম পায় না, তবে দীর্ঘসময় ভিজিয়ে রাখা ও পরবর্তী ব্যবহারের পদ্ধতি অনেকটা পান্তাভাতের মতো।
নাইগেল টমসন ও অন্যান্য প্রোবায়োটিক গবেষকরা দাবি করেন, গাঁজনজাত বা দীর্ঘসময় ভিজানো ভাতের ফাইটেট মাত্রা কমে যায়, যার ফলে আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিঙ্কসহ বিভিন্ন উপকারী খনিজ সহজে দেহে শোষিত হয়। ফাইটেট শরীরের মধ্যে পুষ্টি বন্ধনকারী হিসেবে কাজ করে- তাই পান্তার মতো প্রক্রিয়ায় এটি দুর্বল হলে শরীর উপাদানগুলো যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রোবায়োটিক গবেষণায় দেখা গেছে, পান্তাভাত বা অনুরূপ গাঁজনজাত ভাতে ল্যাকটোবাসিলাস (Lactobacillus) ও অন্যান্য উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়- যা অন্ত্রের ব্যালান্সকে উন্নত করে, হজমশক্তি বাড়ায় ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সমর্থন করে।
বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে,
- পান্তাভাতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম ও জিঙ্কের পরিমাণ সাধারণ ভাতের তুলনায় অনেক বেশি শোষণযোগ্য রূপে থাকে।
- গাঁজনের ফলে অ্যান্টি-নিউট্রিশনাল উপাদানগুলো যেমন ফাইটেট দুর্বল হয়ে যায়, ফলে পুষ্টি শোষণ বাড়ে।
- উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্য, ইমিউন সিস্টেম ও জৈবিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
- নিয়মিত পান্তাভাত গ্রহণ রক্তের হিমোগ্লোবিন গঠনে সহায়তা, হাড়ের গঠন মজবুত করা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও শরীরের সার্বিক পুষ্টি ধরে রাখা সম্ভব করতে পারে।
পান্তাভাত কেবল দক্ষিণ এশিয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী খাদ্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক খাদ্য-সংস্কৃতি ও বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় এটি উচ্চ পুষ্টিসমৃদ্ধ, সহজে প্রস্তুতযোগ্য ও কার্যকর খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। থাইল্যান্ডের ন্যাও নিয়া, জাপানের গাঁজানো ভাত, কোরিয়ার গাঁজনজাত খাদ্যরীতি এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, বিশ্বজুড়ে গাঁজন বা দীর্ঘ সময় ভিজিয়ে রাখা ভাতের মত পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে।
সঠিক পদ্ধতিতে পান্তাভাত তৈরি ও গ্রহণ করলে এটি শরীরের জন্য একটি শক্তিশালী পুষ্টির উৎস হতে পারে এবং বিশ্বজনীন খাদ্যজ্ঞান ও পুষ্টিবিজ্ঞানের আলোচনায় এর স্থান আরও সুদৃঢ় হতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








