বাড়ছে বিদ্যুতের দাম: ইউনিটপ্রতি দেড় টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব
ফাইল ছবি
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার অজুহাতে দেশে জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাসের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বিদ্যুৎ বিভাগ পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠিয়েছে।
একই সঙ্গে খুচরা পর্যায়েও ব্যবহারভিত্তিক ভিন্ন হারে দাম সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে গড়ে ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হতে পারে, যা জুন মাসের শুরু থেকেই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বুধবার (০৬ মে) বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ প্রস্তাব প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, পিডিবির প্রস্তাব কমিশনে প্রাথমিকভাবে গৃহীত হয়েছে এবং এখন এটি কারিগরি কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর পৃথক প্রস্তাবও ধাপে ধাপে জমা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী সব প্রস্তাব বিশ্লেষণের পর অংশীজনদের নিয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে যৌক্তিকতা যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে কমিশন। ঈদুল আজহার ছুটিসহ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বিবেচনায় নতুন দাম কার্যকরের সিদ্ধান্ত আগামী এক মাসের মধ্যে আসার সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্টরা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
পিডিবির প্রস্তাবের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাস-এলএনজি ও কয়লার দামের অস্থিরতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধানকে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, বর্তমান ট্যারিফে বিদ্যুৎ বিক্রি অব্যাহত থাকলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঘাটতি ৫৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জ, উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় কম ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ও চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা ইতোমধ্যে ৩৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং বাস্তবে এর পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: এপ্রিলের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ৪০৪
বিদ্যুৎ বিভাগের নথি অনুযায়ী, উৎপাদন খরচ ও গ্রাহক পর্যায়ের ট্যারিফের মধ্যে ইউনিটপ্রতি গড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ টাকার ব্যবধান রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে প্রতি ইউনিটে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কয়েক হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি হ্রাস এবং মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে আর্থিক দক্ষতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বলে নীতিগত আলোচনায় উল্লেখ রয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, লাইফলাইন বা স্বল্প ব্যবহারকারী গ্রাহক, যারা মাসে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের ওপর আপাতত মূল্যবৃদ্ধির চাপ না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। তবে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহক, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে তুলনামূলকভাবে বেশি হারে সমন্বয় হতে পারে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৬৩ শতাংশ গ্রাহক এই লাইফলাইন শ্রেণিভুক্ত হলেও বাকি ৩৭ শতাংশ গ্রাহকের বিল বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ দাম বৃদ্ধি পায়। সেই সময় পাইকারি ইউনিটপ্রতি দাম ৭.০৪ টাকায় পৌঁছায়। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুতের মূল্য কাঠামোতে এক বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, যা শিল্প উৎপাদন ব্যয় ও সাধারণ জীবনযাত্রার খরচে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ অবস্থায় মূল্য সমন্বয় না করলে ভর্তুকির চাপ রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা এবং অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ না করে মূল্যবৃদ্ধি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে খরচ কমানো জরুরি।
সব মিলিয়ে বিদ্যুতের নতুন দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখন কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন, গণশুনানি এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আগামী জুন মাসের শুরু থেকেই নতুন দর কার্যকর হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








