News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৩৭, ৬ মে ২০২৬

নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্কে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে নয়াদিল্লি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্কের যে শীতলতা বা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে এবার সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারত সরকার। 

তবে এই যাত্রায় ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশ যদি তার নিজস্ব অগ্রাধিকারগুলো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে, তবেই দিল্লি সব ধরনের অমীমাংসিত ইস্যুতে বিস্তারিত সংলাপে বসতে প্রস্তুত। নয়াদিল্লি সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি এই ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন। 

তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পারস্পরিক মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তিতেই আগামী দিনের সম্পর্ক পুনর্গঠিত হবে, যেখানে বর্তমানে স্থবির হয়ে থাকা ৪০টিরও বেশি দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া পুনরায় সক্রিয় করার কাজ শুরু হয়েছে।

বিগত কয়েক মাসে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের গতি কিছুটা ধীর থাকলেও ভারত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব। 

তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালে তাঁর ঢাকা সফর এবং ২০২৫ সালে ব্যাংককে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের মাধ্যমে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গেও ভারতের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে এবং বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ভারত মূলত তাড়াহুড়ো না করে একটি সুদৃঢ় ও কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে নজর দিচ্ছে। বাণিজ্য বৃদ্ধি, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সেপা (CEPA) চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে দুই দেশই এখন সমানভাবে আগ্রহী। ভারতের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক সংহতি বজায় রাখা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বিক্রম মিশ্রি। তিনি জানান, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে এবং বিগত তিন দশকে এই চুক্তিটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমেই এই চুক্তি নবায়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। 

অন্যদিকে, তিস্তা চুক্তির জট প্রসঙ্গে তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার কথা স্বীকার করলেও ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় ভারত অত্যন্ত আন্তরিক বলে দাবি করেন। 

তিনি জানান, পানি খাতের সহযোগিতা সরাসরি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত, তাই যৌথ নদী কমিশন ও কারিগরি কমিটির মাধ্যমে আলোচনা আরও বেগবান করা হবে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের একচ্ছত্র অধিকারকে কাজে লাগিয়ে এসব অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানে ভারত সরকার ইতিবাচক ফলাফল প্রত্যাশা করছে।

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্নে বিক্রম মিশ্রি কোনো সরাসরি বা চূড়ান্ত মন্তব্য করেননি। তবে তিনি কূটনৈতিক ভাষায় জানিয়েছেন, ভারত সব বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি 'বাস্তবসম্মত' উপায়ে যোগাযোগ রক্ষা করতে চায়। একইভাবে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বাংলাদেশ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কিত মন্তব্যগুলো নিয়ে ভারত সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন তিনি। 

আরও পড়ুন: প্রতিবেশী ও বিনিয়োগে অগ্রাধিকার সরকারের: মির্জা ফখরুল

মিশ্রি জানান, এ ধরনের মন্তব্যগুলো একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে করা এবং এগুলোকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখাই শ্রেয়। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির বৃহত্তর ক্যানভাসে এই ধরনের বক্তব্য যেন ছায়া না ফেলে, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মূলত দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে গিয়ে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভারত কোনো নির্দিষ্ট দল নয়, বরং বাংলাদেশের সব সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে আগ্রহী এবং নির্বাচনের মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের কোনো হস্তক্ষেপ বা 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং' ছিল না।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ওপর তৃতীয় কোনো দেশের প্রভাব নিয়ে ভারতের উদ্বেগ ও পরামর্শও উঠে এসেছে এই আলোচনায়। ভারত মনে করে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখে। 

তবে ভারত প্রত্যাশা করে, তৃতীয় কোনো শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেন এমন পর্যায়ে না পৌঁছায় যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ‘বিষাক্ত সাপ বা কুমির’ ছাড়ার মতো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরগুলোকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব। তিনি একে গুজব হিসেবে অভিহিত করে হাসিমুখে সত্যতা উড়িয়ে দেন। 

জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তিনি বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করে জানান, মধ্যপ্রাচ্য সংকট বা বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতার মধ্যেও ভারত বাংলাদেশে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখবে, যেমনটা অতীতেও করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও দিল্লির সঙ্গে কলকাতার সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করেছে। 

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, অতীতে রাজ্য সরকারের বিরোধিতার কারণে অনেক কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকলেও এখন পরিস্থিতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে থাকলেও সীমান্তবর্তী রাজ্যের বাস্তব স্বার্থ সেখানে গুরুত্ব পায়। 

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখন থেকে দিল্লি ও ঢাকা কোনো চুক্তিতে উপনীত হলে রাজ্য সরকার হয়তো আর পূর্বের মতো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। বরং রাজ্যের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও কেন্দ্রীয় সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে জ্বালানি ও পানিবণ্টন চুক্তিগুলো আরও টেকসই এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।

সবশেষে, ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, পারস্পরিক বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দুই দেশের মানুষের কল্যাণই হবে আগামী দিনের ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়