ঠান্ডায় জমজমাট ‘ফাটা কোম্পানি’ কাপড়ের ব্যবসা
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
টানা শৈত্যপ্রবাহ ও কনকনে ঠান্ডায় রংপুর বিভাগের অর্থনীতিতে নতুন করে চাঙা হয়েছে একটি মৌসুমি অনানুষ্ঠানিক বাজার—‘ফাটা কোম্পানি’ নামে পরিচিত কমদামের শীতবস্ত্রের ব্যবসা। চলতি শীত মৌসুমে এই খাতের বেচাকেনা গেল কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু রংপুর বিভাগেই এবছর এই বাজারে দ্বিগুণের বেশি লেনদেন হতে পারে।
ঠান্ডার তীব্রতায় কম খরচে শীতবস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দিনমজুর, কৃষক, ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি অংশও এই বাজারমুখী হচ্ছে। ফলে মৌসুমি হলেও ‘ফাটা কোম্পানি’ ব্যবসা এখন রংপুর অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নগদ অর্থপ্রবাহের উৎসে পরিণত হয়েছে।
রেলস্টেশন এলাকা, বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, সড়কের ধারে ও জনসমাগমপূর্ণ স্থানে অস্থায়ীভাবে গড়ে ওঠে এসব ‘ফাটা কোম্পানি’ দোকান। এর মধ্যে রংপুর নগরীর আলমনগর ও স্টেশন এলাকা সবচেয়ে বড় হাব হিসেবে পরিচিত। এখানে এক শতাধিক দোকানে একযোগে খুচরা ও পাইকারি পুরাতন শীতবস্ত্র কেনাবেচা হয়।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, এসব বাজার থেকে দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাও, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও নীলফামারীর খুচরা বিক্রেতারা কমদামে শীতবস্ত্র কিনে নিজ নিজ এলাকায় সরবরাহ করেন। ফলে একটি আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইন গড়ে উঠেছে, যা পুরো শীত মৌসুমজুড়ে সক্রিয় থাকে।
‘ফাটা কোম্পানি’ দোকানগুলোতে ২০–৮০ টাকায় টুপি ও মাফলার, ১০০–৩০০ টাকায় সোয়েটার, জ্যাকেট ও চাদর এবং ৩০০–৬০০ টাকায় কম্বল বিক্রি হয়। এসব পণ্যের বেশিরভাগই গার্মেন্টসে বিভিন্ন কারণে বাতিল হওয়া বা সেকেন্ড হ্যান্ড শীতবস্ত্র।
একই ধরনের শীতবস্ত্র গার্মেন্টস বা সুপার মার্কেট থেকে কিনতে গেলে ক্রেতাকে ৫ থেকে ৭ গুণ বেশি দাম দিতে হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিটি পণ্যে লাভের মার্জিন কম হলেও বিক্রির পরিমাণ বেশি হওয়ায় মোট আয় সন্তোষজনক থাকে—যা এই খাতের মূল ব্যবসায়িক শক্তি।
রংপুর নগরীর স্টেশন এলাকার ব্যবসায়ী মনসুর আলী ব্যাপারী জানান, তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
তার হিসাবে, গেল শীতে তার বিক্রি ছিল প্রায় ১৫ লাখ টাকা। কিন্তু চলতি মৌসুমে ৪ জানুয়ারি পর্যন্তই বিক্রি ছাড়িয়েছে ২৪ লাখ টাকা। পুরো মৌসুম শেষে বিক্রি ৩০-৩৫ লাখ টাকা ছাড়াতে পারে বলে তিনি আশা করছেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কমদামে শীতবস্ত্র এনে খুচরা ও পাইকারিতে বিক্রি করি। প্রতিটি পণ্যে লাভ কম, কিন্তু ভলিউম বেশি—এটাই আমাদের ব্যবসার মূল কৌশল,” বলেন তিনি।
আলমনগরের ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন জানান, নভেম্বরে ৯ লাখ টাকার শীতবস্ত্র তুলে ডিসেম্বরের ২০ তারিখের মধ্যেই বিক্রি শেষ হয়ে যায়। পরে আবার ১৫ লাখ টাকার মাল তোলেন, যার অর্ধেকের বেশি ইতোমধ্যে বিক্রি হয়েছে। তার মতে, এবছর পুরাতন শীতবস্ত্রের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা মানুষ নেদারল্যান্ডসের, বাংলাদেশের মাঝারি
একই এলাকার ব্যবসায়ী আতোয়ার রহমান জানান, আগে প্রতিটি জেলায় গড়ে ৬০–৭০টি ‘ফাটা কোম্পানী’ দোকান বসত। এবছর তা বেড়ে ১০০–১২০টিতে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি দোকানে গড়ে এক লাখ টাকার বেশি পণ্য মজুত থাকে।
তার হিসাব অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে আগে শীত মৌসুমে এই খাতে গড়ে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার লেনদেন হতো। এবছর তা বেড়ে ১৮-২০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
লালমনিরহাট শহরের ব্যবসায়ী সোহেল রানা জানান, ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে তার দোকানে বিক্রি হঠাৎ বেড়ে যায়। গত দুই সপ্তাহেই আড়াই লাখ টাকার শীতবস্ত্র বিক্রি করেছি, যেখানে গত বছর পুরো মৌসুমে বিক্রি ছিল মাত্র দুই লাখ.।
কুড়িগ্রামের কলেজ রোডের আজিজার রহমান জানান, তিনি প্রতিদিন গড়ে চার শতাধিক পুরাতন শীতবস্ত্র বিক্রি করছেন। তার মতে, এই বাজার না থাকলে নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তি যেমন বাড়ত, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও নগদ টাকার প্রবাহ কমে যেত।
তিনি জানান, এবছর ঠান্ডার তীব্রতার কারণে সচ্ছল ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক মানুষও ‘ফাটা কোম্পানি’ বাজারে আসছেন। এতে বিক্রির পরিমাণ আরও বেড়েছে।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদেরপাড়ের কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, ১২ সদস্যের পরিবারের জন্য তিনি ‘ফাটা কোম্পানি’ দোকান থেকেই শীতবস্ত্র কিনেছেন। ৮টি সোয়েটার, ১০টি জ্যাকেট, ৪টি মাফলার, ৬টি টুপি ও ৪টি কম্বল কিনে খরচ হয়েছে ৭ হাজার ২০০ টাকা। এসব জিনিস নতুন কিনতে গেলে অন্তত ৪০ হাজার টাকা লাগত,” বলেন তিনি।
লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ের দিনমজুর আক্তার আলী বলেন, “মার্কেট থেকে নতুন গরম কাপড় কেনার সামর্থ্য আমাদের নেই। ‘ফাটা কোম্পানি’ দোকান না থাকলে ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করাই কঠিন হয়ে যেত। গরিব মানুষের জন্য এসব দোকান আশীর্বাদ।
কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন জানান, সরকারি কম্বল বিতরণ চললেও চাহিদার তুলনায় তা কম। ফলে সাধারণ মানুষ বাজার থেকেই শীতবস্ত্র কিনতে বাধ্য হচ্ছে, যা এই খাতের ব্যবসা বাড়াচ্ছে। ‘চাহিদামত কম্বলের বরাদ্দ পেতে আমরা মন্ত্রণালয়কে পত্র দিয়েছি।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গেল ১৯ ডিসেম্বর থেকে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭.৫ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রয়েছে এবং কুয়াশা ও হিমেল বাতাস অব্যাহত থাকায় ঠান্ডার প্রকোপ বেশি অনুভূত হচ্ছে। আগামী আরো কয়েকদিন এরকম আবহাওয়া বিরাজমান থাকতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি








