স্বস্তির শিলাবৃষ্টিতে ভিজল ঢাকা, শুরু হলো প্রাক-মৌসুমি বৃষ্টিবলয় ‘গোধূলি’
ছবি: সংগৃহীত
ফাল্গুনের তপ্ত রোদে যখন রাজধানীবাসীর নাভিশ্বাস উঠছিল, তখনই স্বস্তির বার্তা নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নামল বছরের প্রথম শিলাবৃষ্টি।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সন্ধ্যা ৭টার পর হঠাৎ করেই মেঘাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে ঢাকার আকাশ। কিছুক্ষণ পরেই রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, লিংক রোড, গুলশান, ভাটারা, মিরপুর, উত্তরা, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। কোথাও কোথাও বজ্রপাত ও দমকা হাওয়াও দেখা গেছে।
বসন্তের শেষ ভাগে এই আকস্মিক বৃষ্টিতে জনজীবনে স্বস্তি ফিরলেও ইফতার পরবর্তী ঈদ কেনাকাটায় বের হওয়া নগরবাসীকে কিছুটা সাময়িক ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
ইফতারের আমেজ কাটতে না কাটতেই শুরু হওয়া এই বৃষ্টিতে কয়েকদিনের অসহনীয় গরম কিছুটা কমে গিয়ে নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। তবে একই সঙ্গে সন্ধ্যার পর কেনাকাটায় বের হওয়া অনেক মানুষকে কিছুটা ভোগান্তিতেও পড়তে হয়, কারণ পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখন কেনাকাটার ব্যস্ততা চলছে।
রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও গুলশানসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় শিলাবৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সন্ধ্যার পর আকাশের একাংশ কালো হয়ে আসে এবং কিছু সময়ের মধ্যেই শুরু হয় শিলাবৃষ্টি ও ঝুম বৃষ্টি। রাত ৮টার দিকে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোথাও কোথাও দমকা হাওয়া বইছিল।
এদিকে আবহাওয়ার এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে খেলাধুলার ময়দানেও। বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ–পাকিস্তান ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ ২৭৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৬ দশমিক ৩ ওভারে ৩ উইকেটে ২৭ রান তোলার পরই খেলা বন্ধ হয়।
এর আগে শুক্রবার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল বাংলাদেশ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ দল (বিডব্লিউওটি)। সংস্থাটি জানায়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দিয়ে বছরের প্রথম প্রাক-মৌসুমি বৃষ্টিবলয় ‘গোধূলি’ সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে দেশের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এলাকায় কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত ও বৃষ্টিপাত হতে পারে।
আরও পড়ুন: আসছে বৃষ্টি বলয় ‘গোধূলি’, দেশজুড়ে বজ্রবৃষ্টির শঙ্কা
পূর্বাভাস অনুযায়ী, শুক্রবার রাত থেকেই বৃষ্টিবলয়টি সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের মধ্য দিয়ে দেশে প্রবেশ করতে পারে এবং আগামী ১৮ মার্চের দিকে উপকূলীয় এলাকা দিয়ে দেশ ত্যাগ করতে পারে। বিশেষ করে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব এলাকায় কয়েক দফায় কালবৈশাখী ঝড় এবং বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টিও হতে পারে।
বিডব্লিউওটির তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টিবলয়টির প্রভাবে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকবে। এছাড়া ঢাকা বিভাগের উত্তর-পূর্বাংশ, চট্টগ্রাম বিভাগের উত্তরাংশ এবং রংপুর বিভাগের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি। তবে বরিশাল এবং খুলনা ও চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির সক্রিয়তা তুলনামূলক কম থাকতে পারে।
এই সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে মাঝারি থেকে তীব্র বজ্রপাত এবং বিক্ষিপ্ত শিলাবৃষ্টিও হতে পারে। একই সময়ে উত্তর বঙ্গোপসাগর সামান্য উত্তাল থাকতে পারে বলেও সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে সিলেট বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় সামান্য পাহাড় ধসের ঝুঁকিও থাকতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে এই বৃষ্টিবলয়ের কারণে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই। বরং কৃষি খাতের জন্য এই বৃষ্টি উপকারী হতে পারে। বিডব্লিউওটির মতে, এতে দেশের প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ এলাকার সেচের চাহিদা পূরণ হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত একটি লঘুচাপের বর্ধিতাংশের প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, প্রথম দিন রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের দু-এক জায়গায় দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
শনিবার (১৪ মার্চ) রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।
রোববার (১৫ মার্চ) রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু এলাকায় এবং খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের দু-এক জায়গায় বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।
সোমবার (১৬ মার্চ) ও মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) দেশের সব বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া, বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। বর্ধিত পাঁচ দিনের আবহাওয়ার অবস্থায় বজ্রসহ বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবহাওয়াবিদ শাহানাজ সুলতানা বলেন, ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখী শুরু হয়ে গেছে। বুধবার (১৮ মার্চ) পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে ঝড়বৃষ্টি হতে পারে। এ সময়ের বৈশিষ্ট্যই হলো স্থানীয়ভাবে মেঘ তৈরি হয়ে স্বল্প সময়ের জন্য ঝড়বৃষ্টি হওয়া।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে সিলেটে ৮৩ মিলিমিটার। এছাড়া নেত্রকোনায় ৪৭, মৌলভীবাজারে ৩৬, দিনাজপুরে ১৮, বগুড়া ও নওগাঁয় ১২ মিলিমিটার, পঞ্চগড়ে ১১, ফেনীতে ৯ এবং রংপুরে ৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
অন্যদিকে তাপমাত্রাও বাড়ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে, ৩৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকায় বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৫৭ শতাংশ। এ সময় পশ্চিম বা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৮ থেকে ১২ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল, যা দমকা আকারে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। শনিবার ঢাকায় সূর্যাস্ত হবে সন্ধ্যা ৬টা ৭ মিনিটে এবং সূর্যোদয় হবে ভোর ৬টা ৯ মিনিটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাক্-মৌসুমি এই সময়ে হঠাৎ করে তৈরি হওয়া মেঘ থেকেই কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টি হয়ে থাকে। সাধারণত এসব ঝড়বৃষ্টি দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তবে স্বল্প সময়ের জন্য তাপমাত্রা কমিয়ে এনে পরিবেশে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে।
তবে সামনে ঈদুল ফিতরকে ঘিরে কেনাকাটা ও সম্ভাব্য ঈদযাত্রার সময়ে এমন বিচ্ছিন্ন ঝড়বৃষ্টি মানুষের চলাচল ও খোলা মাঠে ঈদের জামাত আয়োজনের ক্ষেত্রেও কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








