নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৮:৫৯, ৬ আগস্ট ২০২৬

গ্যাস সংকটে পোশাকশিল্পে অশনিসংকেত

গ্যাস সংকটে পোশাকশিল্পে অশনিসংকেত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প বর্তমানে এক বহুমুখী ও তীব্র সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতা, মূল্যচাপ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কঠোর কমপ্লায়েন্সের শর্ত পূরণের পাশাপাশি নতুন রফতানি প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে গিয়ে খাতটি এখন নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের কবলে পড়েছে। মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (FSRU) গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট আকস্মিক গ্যাস ঘাটতিতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের প্রধান রফতানিমুখী শিল্পাঞ্চলগুলোতে, যা সামগ্রিক রফতানি বাণিজ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের দীর্ঘদিনের সুনাম ও আস্থার ভিত্তিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে দেশের গাজীপুর, সাভার, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলের শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলেও, সার্বিক শিল্প কার্যক্রমে এর তীব্র অভিঘাত অনুভূত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং খাতে। এই প্রক্রিয়াগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চচাপের গ্যাসের প্রয়োজন হলেও অনেক শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় ১৫ পিএসআই থেকে কমে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই বা শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এর ফলে বয়লার সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং ডাবল ডাইং, কমপ্যাক্টিং, ফিনিশিং ও স্টিমিংয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ধাপগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আধা-প্রস্তুত কাপড় জমে যাওয়ায় উৎপাদন চক্র দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং পুরো সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা শ্লথ হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সম্প্রতি রাজধানীর গুলশান ক্লাবে বিটিএমএ ও বিজিএমইএর যৌথ সমঝোতা স্মারক সই অনুষ্ঠানে শিল্পের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোর চিত্র তুলে ধরেন। 

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতি, দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা, ব্যাংকের নীতিগত পরিবর্তন এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান কমেছে। যদিও একই সময়ে প্রায় ১৩৯টি নতুন কারখানা চালু হয়েছে এবং চাকরি হারানো শ্রমিকদের একটি অংশ অন্য কারখানায়, বিদেশে কিংবা ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে শ্রমবাজার সচল রেখেছেন, তবুও বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর নেতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক কর্মসংস্থানে স্পষ্ট।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কেবল আর্থিক ক্ষতি বা উৎপাদন হ্রাস নয়; বরং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা। এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, প্রাইমার্ক, গ্যাপ, ওয়ালমার্ট, নাইকি, লেভিস, পিভিএইচ, নেক্সট, ম্যাঙ্গো, টার্গেট এবং আমেরিকান ঈগলসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর অনেকেই বর্তমানে বাংলাদেশের উৎপাদন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য উৎপাদন ও শিপমেন্ট সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে ক্রেতারা ইমেইলের মাধ্যমে দফায় দফায় সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাচ্ছেন এবং কমপ্লায়েন্স টিম পাঠিয়ে বাস্তব অবস্থা যাচাই করছেন।

আরও পড়ুন: টানা পঞ্চমবার পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ

বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বর্তমানে তাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি হ্রাসের সুনির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করে। ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো নতুন ক্রয়াদেশ আকর্ষণে অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ যদি সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, তবে ক্রেতারা খুব সহজেই বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। একবার কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অন্য দেশে সাপ্লাই চেইন গড়ে তুললে হারানো বাজার পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে।

গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানা বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর, এলপিজি বা সিএনজির মতো ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের পূর্বনির্ধারিত মূল্য পরিবর্তনের সুযোগ না থাকায় এই অতিরিক্ত আর্থিক চাপ উদ্যোক্তাদেরই বহন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের ১ হাজারের বেশি রফতানিমুখী নিটওয়্যার ও ডাইং কারখানা ভয়াবহ সংকটের মধ্যে রয়েছে, যার ফলে সেখানকার হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৩.৮৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের রেকর্ড ভাঙা সর্বোচ্চ রফতানির তুলনায় সামান্য কম (প্রায় ২ শতাংশ)। তবে একে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছেন না বিজিএমইএ নেতারা। পুরো বছর বিবেচনায় রফতানি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের ওপরে ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের মূল্য সংযোজন (Value Addition) নিশ্চিত করে ১০০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনই তাদের মূল পরিকল্পনা।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বিজিএমইএ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংগঠন বায়ার্স ফোরাম বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছে। 

বিজিএমইএর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মহেশখালীর মেরামতাধীন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল আগামী ৬ থেকে ৭ আগস্টের মধ্যে সচল হতে পারে এবং ৮ আগস্টের পর থেকে গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ী উন্নতি আশা করা হচ্ছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ১৪ আগস্টের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ অনেকটাই স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে। পাশাপাশি, ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে ১ থেকে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত শিপমেন্ট বিলম্বের সুযোগ কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে বিবেচনা করার জন্য ক্রেতাদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে বিজিএমইএ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) যৌথভাবে আগামী ডিসেম্বরে বা আগামী বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল মেশিনারি এক্সিবিশন (বিটমা) প্রদর্শনী আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো আধুনিক ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, বিএমআরই (মডার্নাইজেশন ও রিহ্যাবিলিটেশন) কার্যক্রম জোরদারকরণ এবং শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তোলার মাধ্যমে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা। 

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সংকটের এই সাময়িক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি নতুন এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থলভিত্তিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করলেই কেবল বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের নিরঙ্কুশ ও টেকসই আধিপত্য নিশ্চিত করা সম্ভব।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়