অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি
ছবি: সংগৃহীত
ক্রিকেট বিশ্বের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে রূপকথার মতো এক দিন কাটাচ্ছে বাংলাদেশ। মারারা ওভালে স্বাগতিকদের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দুই দিনেই দুর্দান্ত দাপট দেখিয়ে চালকের আসনে চলে এসেছে সফরকারীরা। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১৯৮ রানের জবাবে ৬ উইকেট হারিয়ে ৩৫১ রান করেছে বাংলাদেশ। হাতে এখনও ৪ উইকেট নিয়ে টাইগারদের লিড দাঁড়িয়েছে ১৫৩ রানে। প্রস্তুতি ম্যাচের হতাশা পেছনে ফেলে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা যেভাবে অজিদের কোণঠাসা করে রেখেছে, তাতে বিস্মিত ক্রিকেট বিশ্বও।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে এর আগে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের সেঞ্চুরি করার রেকর্ড ছিল না। সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে দিয়েছেন তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। কদিন আগে সিএ একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে ইনিংস ও ৩৮ রানে হেরে যাওয়া দলটিই মূল লড়াইয়ে এসে পুরোপুরি বদলে গেছে। টেস্ট ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ম্যাচেই খেলতে নেমে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেন তানজিদ।
অজি অফ স্পিনার নাথান লায়নের বলকে লং অফে ঠেলে দিয়ে সিঙ্গেল নিয়েই আনন্দে ফেটে পড়েন এই বাঁহাতি ব্যাটার। হেলমেট খুলে শূন্যে উড়ে উল্লাস করার পাশাপাশি ব্যাট উঁচিয়ে মারারা ওভালের গ্যালারির দর্শকদের অভিনন্দনের জবাব দেন তিনি। অজিদের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে ধৈর্য ও দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে ১৯৭ বলে ৮ চার ও ১ ছক্কায় ১০১ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেন তানজিদ।
১৯৬৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম ইনিংসে তিন অঙ্ক ছুঁয়েছিলেন হানিফ মোহাম্মদ। দীর্ঘ ৬২ বছর পর ডারউইনে সেঞ্চুরি করে যেন সেই স্মৃতিই মনে করালেন তানজিদ। আর ২০০৬ সালে ফতুল্লায় শাহরিয়ার নাফিসের পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে দ্বিতীয় সেঞ্চুরিয়ান বনে গেলেন এই বাঁহাতি ওপেনার।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের এই বিশেষ মুহূর্তটি মা-বাবাকে উৎসর্গ করে তানজিদ বলেন, সেঞ্চুরি যেহেতু অবশ্যই স্পেশাল, আমি আমার বাবা-মায়ের জন্য এটা দিতে চাই। দিনশেষে আমার দ্বিতীয় টেস্টে সেঞ্চুরি, সত্যিই একটা ভালো লাগার মুহূর্ত।
অস্ট্রেলিয়ার পেস ও বাউন্স সামলাতে নতুন বলের মোকাবিলায় বাড়তি ঝুঁকি না নিয়ে বলের মেরিট অনুযায়ী খেলেছেন তানজিদ তামিম। ইনিংস গড়ার পথে তিনি পেয়েছেন সতীর্থদের দারুণ সব জুটি। মুমিনুল হকের সঙ্গে ১০২ রান এবং অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে ৯৩ রানের গুরুত্বপূর্ণ দুটি জুটি গড়ে বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেন এই ওপেনার।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশি পেসারদের তাণ্ডবে ১৯৮ রানে অলআউট অস্ট্রেলিয়া
দলের পক্ষে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ৮৪ রানের চমৎকার একটি ইনিংস খেলেন। এছাড়া অভিজ্ঞ ব্যাটার মুমিনুল হক অবদান রাখেন দলের সংগ্রহে। তবে দিনের শেষ সেশনে ২৯৭ থেকে ৩০৬ রান এই মাত্র ১১ রানের ব্যবধানে ৩ উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়েছিল বাংলাদেশ। সেই চাপ কাটিয়ে দিনশেষে দারুণ প্রতিরোধ গড়েছেন অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ ও পেসার হাসান মাহমুদ। সপ্তম উইকেটে ৪৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে দিন শেষ করেছেন তারা। মিরাজ ৩২ এবং হাসান ১৩ রান নিয়ে তৃতীয় দিনে ব্যাট করতে নামবেন।
ম্যাচের প্রথম দিনে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। তবে মারারা ওভালের পিচে টাইগার বোলারদের তোপে প্যাট কামিন্সের দল মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হয়ে যায়। অজিদের পক্ষে একমাত্র প্রতিরোধ গড়েছিলেন স্টিভ স্মিথ, যিনি করেন ৭১ রান। বাকি ব্যাটাররা বাংলাদেশি পেসারদের তোপে টিকতে পারেননি।
বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তরুণ পেসার হাসান মাহমুদ। ৫৫ রান খরচ করে ৬ উইকেট শিকার করে টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং ফিগার অর্জন করেছেন তিনি। তার নিখুঁত লাইন-লেন্থ ও সুইং সামলাতে ব্যর্থ হয় অজি ব্যাটিং লাইনআপ। বল হাতে হাসান ও ব্যাট হাতে তানজিদ-শান্তদের নৈপুণ্যে প্রথম দুই দিন পুরোপুরি নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশ।
সিরিজ শুরুর আগে অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন ও নিজেদের ব্যাটিং নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় ছিল বাংলাদেশ দল। বিশেষ করে কদিন আগে ডারউইনেই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে ইনিংস ও ৩৮ রানের লজ্জার হার সেই শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মূল লড়াইয়ে নেমেই সেই সব সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে টাইগাররা।
বাংলাদেশের এমন অভাবনীয় ও দাপুটে পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ হয়েছেন ভারতের সাবেক তারকা ক্রিকেটার ও বিশ্লেষক রবিচন্দ্রন অশ্বিন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি লিখেছেন, ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশ, এটা যে কারও ভাবনার বাইরে ছিল। প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার পর প্রথম টেস্টের প্রথম দুই দিনেই এমন দাপট দেখানো কী দারুণ এক ঘুরে দাঁড়ানো।
তৃতীয় দিনে বড় লিড নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে আরও বেশি চাপে ফেলার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে বাংলাদেশ। ডারউইনের বাইশ গজে টাইগাররা যেভাবে নিজেদের মেলে ধরেছে, তাতে টেস্ট ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় রচনার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








