স্পোর্টস ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:৪৭, ৬ আগস্ট ২০২৬

ফিফা বাণিজ্য বিতর্কে ক্ষমা চেয়ে পদে বহাল ইনফান্তিনো

ফিফা বাণিজ্য বিতর্কে ক্ষমা চেয়ে পদে বহাল ইনফান্তিনো

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপসহ ফুটবলের বড় টুর্নামেন্টগুলোর অংশীদারিত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। প্রক্রিয়াগত ভুল ও অস্বচ্ছতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ার পর তিনি এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিত ফিফার জরুরি বৈঠকে শীর্ষ নির্বাহীদের সমর্থন পাওয়ায় আপাতত ফিফার সভাপতি হিসেবে নিজের পদে বহাল থাকছেন তিনি।

গত জুলাইয়ের শেষ দিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস-এ ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি গোপন বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ফাঁস হয়। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (FFE) নামের একটি নতুন সহযোগী বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠন করা। পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক ও অপারেশনাল স্বত্ব এই নতুন কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

উক্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বা প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪ বিলিয়ন বা তার বেশি ডলার তোলার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। সম্ভাব্য প্রধান বা অ্যাঙ্কর বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল নিউইয়র্কভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ইটার্নাল-এর, যা পরিচালনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনার। এছাড়া এই প্রস্তাবে সায় দেওয়ার বিনিময়ে ফিফার প্রতিটি সদস্য-অ্যাসোসিয়েশনকে চার কোটি ডলার করে দেওয়ার লোভনীয় ও আকর্ষণীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

পরিকল্পনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই বিশ্ব ফুটবলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা (UEFA) এই প্রস্তাবকে একটি অস্বচ্ছ ও অনাকাক্সিক্ষত চুক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়ে কঠোর অবস্থান নেয়। উয়েফার অধিভুক্ত ৫৫টি দেশের সদস্য-অ্যাসোসিয়েশনগুলো এই পরিকল্পনা বাতিল না করলে ফিফার সব প্রতিযোগিতা বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

উয়েফার পাশাপাশি উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ (CONCACAF) এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও (AFC) এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কড়া বিবৃতি প্রকাশ করে। শুধু বাইরের সংস্থাই নয়, ফিফার অভ্যন্তরীণ প্রশাসন থেকেও তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ফিফার প্রধান অপারেটিং কর্মকর্তা (COO) কেভিন ল্যামৌর এই উদ্যোগকে এক ব্যক্তির একক প্রকল্প বলে অভিহিত করেন এবং জানান যে সাধারণ কর্মীদের অন্ধকারে রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া হোয়াইট হাউসের টাস্কফোর্সে ফিফার প্রতিনিধি ও ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস করদেইরো এই পদক্ষেপে সংক্ষুব্ধ হয়ে তার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের পর্তুগিজ কিংবদন্তি লুইস ফিগোসহ বেশ কিছু বিশিষ্ট ফুটবল ব্যক্তিত্ব ইনফান্তিনোর তীব্র সমালোচনা করে তার অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিসহ রাজনৈতিক অঙ্গ থেকেও ইনফান্তিনোর ওপর অনাস্থা প্রকাশ করা হয়।

আরও পড়ুন: ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে একজোট তিন কনফেডারেশন, ফিফা অচলের হুঁশিয়ারি

চারিদিকে প্রবল চাপের মুখে পড়ে গত শনিবার ইনফান্তিনো তার আলোচিত ২০ বিলিয়ন ডলারের এই বাণিজ্যিক পরিকল্পনা বা এফএফই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেন। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে মরক্কোর রাবাতে ফিফার আফ্রিকান কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নিয়ে একটি জরুরি সভা আহ্বান করেন তিনি।

সেই বৈঠকে ফিফা মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোমসহ পর্ষদের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে অভ্যন্তরীণ স্মারকে গ্রাফস্ট্রোম পুরো ঘটনাকে একটি দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনাক্রম বলে উল্লেখ করলেও, বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতিতে সুর পাল্টান তিনি। ইনফান্তিনো এবং গ্রাফস্ট্রোম যৌথভাবে ফিফার সহসভাপতি, কাউন্সিল এবং ২১১টি সদস্যদেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কাছে পাঠানো এক স্বাক্ষর করা চিঠিতে নিজেদের ভুলের জন্য আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

ফিফার পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয় যে, এফএফই সম্পর্কিত পুরো প্রক্রিয়াটিতে ভুলত্রুটি ছিল এবং ফিফা কাউন্সিল ও সদস্যদেশগুলোকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা উচিত হয়নি। সংবাদমাধ্যমে খবর ফাঁস হওয়ার পর পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রেও ঘাটতি ছিল বলে তারা মেনে নেয়।

তবে একই সঙ্গে ফিফা সতর্ক করে জানিয়েছে যে, সংস্থার ভাবমূর্তি, সুশাসন ও নিয়মকানুন নিয়ে কোনো ধরনের আক্রমণ আর বরদাশত করা হবে না এবং সুনাম রক্ষায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

রাবাতের ওই চার ঘণ্টার বৈঠক শেষে ফিফার পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ২১১টি সদস্যদেশের ভোটে নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর পরিচালনা পর্ষদের পূর্ণ আস্থা ও সমর্থন রয়েছে। মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফৌজি লেকজা এই পরিকল্পনা বাতিল করার সিদ্ধান্তকে বিজ্ঞোচিত বলে প্রশংসা করেন এবং বিশ্ব ফুটবলে ইনফান্তিনোর ১০ বছরের অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখেন।

এছাড়া গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন দাবি ফিফা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে যে, মরক্কোর রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার বিনিময়ে তাদের ২০৩০ বিশ্বকাপ ফাইনালের আয়োজক বানানোর কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ফিফা জানিয়েছে, স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ কোথায় হবে, তা যথাসময়ে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

আগামী ২০২৭ সালের মার্চে মরক্কোর রাবাতে ফিফা কংগ্রেসে পরবর্তী সভাপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে নাম জমা দিতে হবে। উয়েফাসহ কিছু ইউরোপীয় দেশ ইনফান্তিনোর ওপর অনাস্থা জানালেও এবং তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, মরক্কোর বৈঠকে পাওয়া শীর্ষ নির্বাহীদের সমর্থন ইনফান্তিনোকে তাঁর চতুর্থ মেয়াদের পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে টিকে থাকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়