মাহবুব সুমনের উদ্ভাবিত সবুজ বিপ্লব ‘বনকাগজ’
প্রকৌশলী মাহবুব সুমন
গাছ কেটে কাগজ তৈরির চিরাচরিত ধ্বংসাত্মক চক্র উল্টে দিয়ে এক অভাবনীয় উদ্ভাবন উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশি তড়িৎ প্রকৌশলী মাহবুব সুমন ও তার প্রতিষ্ঠান শালবৃক্ষ। তাদের উদ্ভাবিত বিশেষ কাগজের নাম ‘বনকাগজ’, যা ব্যবহারের পর মাটিতে ফেলে দিলে তা আবর্জনা না হয়ে উল্টো জন্ম দেয় প্রাণ। একটি পরিত্যক্ত কাগজ থেকে সর্বোচ্চ ১৩ থেকে ১৬ জাতের ফুল, ফল ও সবজির চারা জন্মানো সম্ভব এমন বিস্ময়কর খবর এখন দেশজুড়ে পরিবেশবাদীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বনকাগজকে ভিজিটিং কার্ড, আমন্ত্রণপত্র বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের লিফলেট হিসেবেও ব্যবহার করা যায়, এবং পরে প্রয়োজন না থাকলে এটি ভিজে মাটিতে ফেলে দিলে অঙ্কুরোদ্গমের মাধ্যমে নতুন গাছ জন্মাবে।
নির্বিচারে গাছ কাটা ও বন উজাড়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটি নবায়নযোগ্য সবুজায়নের বার্তা হিসেবে সামনে এসেছে বনকাগজ।
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা এই উদ্ভাবক ও তার প্রতিষ্ঠান ‘শালবৃক্ষ’ ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত হয়েছেন। মাহবুব সুমনের পেশা প্রকৌশলী হলেও ছোটবেলা থেকেই তার পরিবেশের প্রতি গভীর সম্পর্ক ও আগ্রহ ছিল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশ রক্ষায় গবেষণা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত।
মাহবুব সুমন পড়াশোনা করেছেন তড়িৎ প্রকৌশল নিয়ে। পরবর্তীতে জার্মানি ও ভারত থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে কাজ করেছেন টেলিকম ও সরকারি বড় বড় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে। তবে ছোটবেলা থেকেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে শঙ্কা তাকে তাড়া করে ফিরত। ২০৫০ সালের মধ্যে নিজ জেলা নোয়াখালীর উপকূল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই তিনি ২০১৯ সালে স্ত্রী ইকরামুন্নেসা চম্পাকে নিয়ে গড়ে তোলেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘শালবৃক্ষ’।
নিজেদের প্রতিষ্ঠানের জন্য ভিজিটিং কার্ড তৈরি করতে গিয়েই মাহবুব লক্ষ্য করেন, প্রতিদিন হাজার হাজার গাছ কেটে তৈরি হওয়া কার্ডগুলো ব্যবহারের অল্প সময় পরই ডাস্টবিনে চলে যাচ্ছে। এই অপচয় রোধে দীর্ঘ এক বছরের নিবিড় গবেষণা ও অসংখ্যবার ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি সফলভাবে তৈরি করেন বীজযুক্ত এই ‘বনকাগজ’। বর্তমানে তার এই ‘শালবৃক্ষ’ মাতৃ-সংগঠনের অধীনে বনকাগজসহ মোট ১০টি সামাজিক উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে, যার প্রতিটিই প্লাস্টিক দূষণ রোধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করে।
মাহবুব সুমনের কথায়, নিজের প্রতিষ্ঠান শালবৃক্ষের ভিজিটিং কার্ড তৈরি করতে গিয়ে প্রথমবার বনকাগজের ধারণা এসেছে। গবেষণা, পরীক্ষা, ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে টানা এক বছরের প্রচেষ্টায় বনকাগজ তৈরিতে সফল হন তিনি। বনকাগজ তৈরি করে মূল লক্ষ্য হলো প্রতিনিয়ত কাটা হচ্ছে হাজার হাজার গাছ, কিন্তু ভিজিটিং কার্ড বা নিমন্ত্রণপত্রের মেয়াদ শেষে তা ফেলে দেওয়া হচ্ছে এটি পরিবেশবান্ধব সমাধান।
বিশ্বের কিছু দেশে বীজ-কাগজের উদ্ভাবন হলেও, একসঙ্গে ১৩ থেকে ১৬ ধরনের বীজ ব্যবহার করে বনকাগজ তৈরির উদ্যোগ শালবৃক্ষই প্রথম।
মাহবুব জানান, বনকাগজ তৈরি করতে প্রচুর সময়, ধৈর্য ও উৎসর্গ প্রয়োজন, এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতি পিস ১২০ থেকে ১৪০ টাকা। তবে শীঘ্রই এটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা সম্ভব হবে।
বনকাগজ মূলত তৈরি হয় পরিত্যক্ত ও বাতিল কাগজ থেকে। যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাগজগুলো কুচিকুচি করে কেটে ৪২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে মণ্ড তৈরি করা হয়। এরপর বিশেষ ফ্রেমিং ট্যাংকে এ৩ (A3) আকারে কাগজ বসিয়ে তাতে বৈচিত্র্যময় বীজ মিশিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ বীজ-কাগজে সচরাচর এক ধরনের বীজ থাকলেও বনকাগজে ৫ থেকে ১১ এমনকি ১৬ জাতের পর্যন্ত দেশি অর্গানিক বীজ থাকে। এর মধ্যে রয়েছে লালশাক, ডাঁটাশাক, কলমিশাক, টমেটো, বেগুন, মরিচ এবং বিভিন্ন ধরনের ফুল।
আরও পড়ুন: নির্বাচনী প্রচারণা শুরু, পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে কড়া নির্দেশ
এই কাগজ তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বীজগুলো যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য উচ্চ তাপমাত্রার বদলে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় বিশেষ ড্রাইং শেলফে এটি শুকানো হয়। মাহবুব সুমন জানান, বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি এ৩ সাইজের কাগজ তৈরিতে খরচ পড়ছে প্রায় ২৫০ টাকা, যা থেকে ৩০টি ভিজিটিং কার্ড তৈরি সম্ভব। বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু হলে এই খরচ অর্ধেকের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী।
বনকাগজ ব্যবহারের পর এটি মাটিতে রোপণ করার জন্য বিশেষ কোনো নিয়মের প্রয়োজন নেই। কাগজটি আস্ত বা টুকরো করে আর্দ্র মাটিতে ফেলে রাখলেই ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে অঙ্কুরোদগম শুরু হয়। এই কাগজে থাকা বীজগুলো প্রায় এক বছর পর্যন্ত সতেজ থাকে। পর্যাপ্ত আলো, বাতাস ও পানির সংস্পর্শে এলে এটি পূর্ণাঙ্গ গাছে রূপ নেয়। গবেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় চারা গজানোর হার প্রায় ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশ।
সাধারণ বীজ-কাগজে এক ধরনের বীজ থাকে, তবে বনকাগজে কমপক্ষে ৫–৬ ধরনের বীজ থাকে। এর লক্ষ্য হলো মাটিতে বৈচিত্র্যময় ‘বন’ সৃষ্টি করা। বনকাগজ ব্যবহার করে পারমাকালচার কৃষি চর্চা সম্ভব, যা মাটিকে পুষ্ট করে, প্রাণি ও উদ্ভিদকে সহায়তা করে, এবং নিরাপদ ফসল নিশ্চিত করে।
ব্যতিক্রমী এই উদ্ভাবনটি ইতিমধ্যে দেশের ভিআইপি ও রাজনৈতিক মহলে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে ভিজিটিং কার্ড, আমন্ত্রণপত্র এবং নির্বাচনি প্রচারণায় এর ব্যবহার বাড়ছে।
ঢাকা-১৭ আসনের প্রচারণায় বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানসহ বিভিন্ন প্রার্থী বনকাগজে প্রচারণাপত্র তৈরি করছেন। এছাড়া বগুড়া-৬ আসনের প্রচারণায় এবং ঢাকা-১৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারপত্রে বনকাগজ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রচারণা শেষে লিফলেটগুলো রাস্তায় না জমে যেন সবজি বাগান বা সবুজায়নে ভূমিকা রাখে।
মাহবুব সুমনের স্বপ্ন কেবল বনকাগজেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ও তার স্ত্রী ইকরামুন্নেসা চম্পা ২০১৯ সালে শালবৃক্ষ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি নবায়নযোগ্য শক্তি ও পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করে।
‘শালবৃক্ষ’র মাধ্যমে তিনি ইতিমধ্যে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বাঁশের তৈরি জগ, মগ এবং পচনশীল প্যাকেজিং উপাদান ‘পলকা’ তৈরি করেছেন। উপকূলীয় মানুষের জন্য তিনি উদ্ভাবন করেছেন বাতাস থেকে সুপেয় পানি তৈরির যন্ত্র। এছাড়া পচনশীল বর্জ্য থেকে সার তৈরির যন্ত্র ‘মাতাল’ এবং দুর্গম অঞ্চলে ব্যবহারের জন্য ‘জিএসএম ফোরজি নেটওয়ার্ক বুস্টার’ তার উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন।
শালবৃক্ষের অধীনে ১০টি সামাজিক উদ্যোগ রয়েছে, যেমন রিনিউএবল এনার্জি সার্ভিস (আরইএস), পলকা, নোয়াহকেম, ইকোপ্যাক, আলো প্রজেক্ট, সিটিইই, ব্যামবাক, ভিন্দুর মাতঙ্গি ও মার্চ এগেইন্সট প্লাস্টিক (ম্যাপ)।
এই উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে
- আরইএস: সৌরবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ, বর্জ্য ও সামুদ্রিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
- পলকা: পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক উপাদান, প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্য।
- নোয়াহকেম: বিষমুক্ত টয়লেট্রিজ ও হাইজিন পণ্য।
- ইকোপ্যাক: পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং সরবরাহ।
- আলো প্রজেক্ট: নগর কৃষি ও শস্য উৎপাদন উদ্ভাবন।
- সিটিইই: প্রযুক্তি শিক্ষা ও দক্ষ জনবল তৈরি।
- ব্যামবাক: বাঁশের বিকল্প পণ্য।
- ভিন্দুর মাতঙ্গি: ডোমেস্টিক উইন্ড টারবাইন।
- ম্যাপ: প্লাস্টিক দূষণ সচেতনতা।
নোয়াখালীর সন্তান মাহবুব সুমন জন্মগ্রহণ করেন কক্সবাজারে, বড় হন ঢাকায়। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে তড়িৎ প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি ও ভারতে যান। দেশে বায়ুশক্তি প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ছোটবেলা থেকেই জলবায়ু ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি আগ্রহী ছিলেন।
শালবৃক্ষের মাধ্যমে মাহবুব সুমন ও ইকরামুন্নেসা চম্পা দেশের ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধারে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে চান এবং আগামী দশ বছরে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছেন।
বিশ্বজুড়ে ২০৩৪ সাল নাগাদ বীজ-কাগজের বাজার ২১৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। মাহবুব সুমন চান, এই বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ যেন বনকাগজের মাধ্যমে নেতৃত্ব দেয় এবং আগামী এক দশকের মধ্যে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুসংস্থান পুনরোদ্ধারে তার এই ‘পারমাকালচার’ কৃষিচর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








