News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:০৮, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
আপডেট: ১১:৩৬, ২২ জানুয়ারি ২০২৬

নির্বাচনী প্রচারণা শুরু, পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে কড়া নির্দেশ

নির্বাচনী প্রচারণা শুরু, পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে কড়া নির্দেশ

পরিবেশবান্ধব বনকাগজে ছাপানো পোস্টার

বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার যুদ্ধ। 

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, এদিন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের প্রচার শুরু করেন। এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র ও রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মিলিয়ে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৭৩ জন। আদালতের রায়ে কিছু প্রার্থীর বৈধতা চূড়ান্ত হলে এই সংখ্যা সামান্য বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে ইসি।

তবে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এক অভূতপূর্ব ও কঠোর আচরণবিধি জারি করেছে, যেখানে প্রথমবারের মতো নির্বাচনী পোস্টার এবং ড্রোন ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার শেষে ২৯৮ আসনে চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১ হাজার ৯৭২ জন প্রার্থী। প্রার্থী সংখ্যার দিক থেকে ঢাকা-১২ আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, আর পিরোজপুর-১ আসনে সর্বনিম্ন দুইজন- বিএনপির আলমগীর হোসেন ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাসুদ সাঈদী- নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। দেশে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এবারের নির্বাচনে ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল প্রার্থী দিয়েছে। দলীয়ভাবে ২ হাজার ৯১টি এবং স্বতন্ত্র হিসেবে ৪৭৮টি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়।

নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, ২২ জানুয়ারি থেকে প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে পারবেন, যা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। একইদিন গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।

এবারের নির্বাচনে আচরণবিধিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন বিধিনিষেধ যুক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে পোস্টার ব্যবহার। একইসঙ্গে ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ ধরনের যেকোনো উড়ন্ত যন্ত্রের মাধ্যমে প্রচারণা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিদেশে কোনো ধরনের জনসভা, পথসভা, সভা-সমাবেশ কিংবা প্রচারণা চালানো যাবে না। একজন প্রার্থী নিজ নিজ সংসদীয় আসনে সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন, যার দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১৬ ফুট এবং প্রস্থ ৯ ফুটের বেশি হতে পারবে না। কেবল ডিজিটাল বিলবোর্ডে বিদ্যুৎ ও আলো ব্যবহার করা যাবে; অতিরিক্ত আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ।

প্রচারণায় পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যানার, ফেস্টুন ও লিফলেটে পলিথিন বা পিভিসি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যানার, ফেস্টুন ও লিফলেট সাদা-কালো রঙে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে এবং নির্ধারিত আকারের বাইরে ব্যবহার করা যাবে না। মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা ও মুদ্রণের তারিখ ছাড়া কোনো প্রচার সামগ্রী ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারের সময় শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেলের মধ্যে রাখতে হবে। তোরণ নির্মাণ ও আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সভা-সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রেও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো জনসভা বা সভা-সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে সময়, স্থান ও তারিখ জানাতে হবে। জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে সড়ক, মহাসড়ক বা জনপথে সভা-সমাবেশ করা যাবে না। যানবাহন ব্যবহার করে কোনো ধরনের মিছিল, শোডাউন কিংবা মশাল মিছিল নিষিদ্ধ। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া অন্য কেউ হেলিকপ্টার বা আকাশযান ব্যবহার করতে পারবেন না।

আরও পড়ুন: নির্বাচন নিয়ে যা বললেন সেনাপ্রধান

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণায়ও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী, তার নির্বাচনী এজেন্ট বা সমর্থক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন, তবে প্রচার শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইলসহ সনাক্তকরণ তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। নির্বাচনী প্রচারে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, চেহারা বিকৃত করা, বানোয়াট বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা যাবে না। প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বা বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা ব্যবহার নিষিদ্ধ। ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না। সব কনটেন্ট প্রকাশের আগে সত্যতা যাচাই করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ভোটার স্লিপ বিতরণ করা গেলেও তাতে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদবি বা প্রতীক উল্লেখ করা যাবে না। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীরা শুধুমাত্র দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করতে পারবেন। সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে তারা কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না।

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা দল আচরণবিধি ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, দেড় লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে। দলের ক্ষেত্রেও দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। গুরুতর অপরাধে তদন্ত সাপেক্ষে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)–এর ৯১ ধারায় প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের হাতে রাখা হয়েছে। গুজব ও এআই অপব্যবহার রোধে আরপিওতে নতুন ধারা যুক্ত করে এসব অপরাধকে নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন অধ্যাদেশ জারি হয় ৪ নভেম্বর। এরপর ১১ নভেম্বর আরপিওর আলোকে সংশোধিত নির্বাচনী আচরণবিধি গেজেট আকারে জারি করে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য জেসমিন টুলী বলেছেন, প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হওয়ার পর এই পর্যায়ে আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত করাই নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিপুল সংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আচরণবিধি বাস্তবায়ন করা কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। আচরণবিধি শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি প্রতিপালনে সহযোগিতা কামনা করে বলেছেন, আচরণবিধি সঠিকভাবে পালন করা হলে নির্বাচন সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন একা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারে না; এ জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহযোগিতা অপরিহার্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়