মাঠ কাঁপানো অপরাজিতা: বাধার দেওয়াল ভেঙে বাংলার নারীশক্তির জয়গান
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের মানচিত্রে একসময় নারীদের পদচিহ্ন ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। সামাজিক রক্ষণশীলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সুযোগের অপ্রতুলতা দীর্ঘকাল তাঁদের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে রেখেছিল। তবে গত এক দশকে সেই জড়তা ভেঙে এক অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটেছে। ক্রিকেট পিচ থেকে ফুটবলের সবুজ গালিচা- সবখানেই এখন বাংলাদেশের নারীদের জয়জয়কার। কেবল অংশগ্রহণ নয়, বরং নেতৃত্ব আর শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে লাল-সবুজের পতাকাকে আসীন করেছেন অনন্য উচ্চতায়। ব্যক্তিগত লড়াই আর অদম্য জেদকে পুঁজি করে নিগার সুলতানা জ্যোতি বা সাবিনা খাতুনরা আজ কেবল ক্রীড়াবিদ নন, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে সাহসের জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে নারী ক্রীড়াবিদদের আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্স ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করেছে। নারী ক্রিকেট ও ফুটবল কেবল খেলার প্রতিযোগিতা নয়; এটি সাহস, অধ্যবসায় এবং স্বপ্নকে বাস্তবায়নের গল্প।
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি রংপুরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলার সময় তাকে অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো, “মেয়েদের জন্য ক্রিকেট কি উপযুক্ত?” তবুও পরিবারের সমর্থন এবং কোচদের উৎসাহে জ্যোতি নিজের খেলা চালিয়ে গেছেন। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর ধীরে ধীরে তিনি দলের নির্ভরযোগ্য ব্যাটার ও উইকেটকিপার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ঐতিহাসিক নারী টি–টোয়েন্টি এশিয়া কাপজয়ী দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে তার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অধিনায়ক হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিনি দলের নেতৃত্বে আত্মবিশ্বাস দেখাচ্ছেন।
অভিজ্ঞ পেসার জাহানারা আলম খুলনায় বেড়ে ওঠেন। শুরুতে হ্যান্ডবলসহ বিভিন্ন খেলায় যুক্ত ছিলেন, পরে ক্রিকেটে আগ্রহ তৈরি হয়। জাতীয় দলের ট্রায়াল থেকে বাদ পড়ার অভিজ্ঞতা তাকে হতাশ করলেও, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি জাতীয় দলে জায়গা পান এবং দীর্ঘদিন প্রধান পেস বোলার হিসেবে দলের সাফল্যে অবদান রাখেন।
জাহানারা বলেন, শুরুর বাধা ও সীমিত সুযোগ আমাকে আরও দৃঢ় করেছে। এখন তরুণীরা যখন ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে ভাবছে, তখন খুবই আনন্দ লাগে।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে কাতারে সব ফুটবল কার্যক্রম স্থগিত
সালমা খাতুন, খুলনার গ্রামীণ অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এক অলরাউন্ডার, সামাজিক চাপ ও পারিবারিক দ্বিধার মধ্যেও ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা ধরে রেখেছেন। স্থানীয় প্রতিযোগিতা থেকে জাতীয় দলে উঠে, দীর্ঘ সময় অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক নারী টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি।
ক্রিকেটের পাশাপাশি নারী ফুটবলও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সাফল্যের গল্প তৈরি করেছে। জাতীয় দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন সাতক্ষীরার গ্রামের মাঠ থেকে শুরু করে দেশের অন্যতম সফল গোলদাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি বিদেশি লিগেও খেলেছেন এবং দেশের ফুটবলে নারী অংশগ্রহণ ও স্বীকৃতিতে পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছেন।
ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রামের স্কুল ফুটবল দলের তারকা সানজিদা আক্তার এবং রাঙামাটির ঋতুপর্ণা চাকমা নতুন প্রজন্মের শক্তি হিসেবে জাতীয় দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ফরোয়ার্ড কৃষ্ণা রানী সরকার এবং রক্ষণভাগের মাসুরা পারভীনও বয়সভিত্তিক দলের মাধ্যমে জাতীয় দলে উঠে দলের শক্তি বাড়াচ্ছেন।
নারী ক্রীড়াবিদদের এই পথচলা সামাজিক বাধা ভাঙার সাহস, স্বপ্নে বিশ্বাস রাখার দৃঢ়তা এবং কঠোর পরিশ্রমের প্রমাণ। আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক দ্বিধা এবং অবকাঠামোগত সমস্যার মধ্যেও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং গণমাধ্যমের স্বীকৃতি তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াবিদদের অর্জন কেবল মাঠের জয়ের কাহিনী নয়; এটি একটি প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা, যেখানে প্রতিটি নারী তার স্বপ্নের বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছে এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








