নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:৩৪, ৪ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব চায় ইইউ: মাইকেল মিলার

বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব চায় ইইউ: মাইকেল মিলার

ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। 

তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশ এখন আর কেবল ঐতিহ্যবাহী দাতা-গ্রহীতার সম্পর্কের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইইউ বাংলাদেশকে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।

রবিবার (০৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর দ্বিতীয় দিনের কর্ম অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে এই সম্মেলনে দেশের রাজনৈতিক রূপান্তর, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, দেশটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গতিশীল অর্থনীতির একটি। সঠিক ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি অর্থনীতির একটিতে পরিণত হতে পারে। 

তবে একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশ বর্তমানে তার উন্নয়ন অভিযাত্রার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। এই যাত্রাপথে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে মসৃণ উত্তরণ, রাজনৈতিক রূপান্তর সামাল দেওয়া, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরুজ্জীবন, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, জলবায়ুগত ঝুঁকি সামলানো এবং একটি জটিল বৈশ্বিক পরিবেশের মুখোমুখি হওয়ার মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইইউ আরও উচ্চাভিলাষী হতে চায় উল্লেখ করে মাইকেল মিলার জানান, অস্ত্র ছাড়া সবকিছু (EBA) শীর্ষক একতরফা বাণিজ্য অগ্রাধিকার ব্যবস্থার আওতায় দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশ বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে, যা দেশের অর্থনীতিকে আজকের এই অবস্থানে আনতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে। এখন দাতা-গ্রহীতার লেন্স থেকে বেরিয়ে ইইউ নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে চায়। এরই অংশ হিসেবে, এলডিসি থেকে বাংলাদেশের মসৃণ উত্তরণ নিশ্চিত করতে কাজ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনা জোরালোভাবে যাচাই করা হচ্ছে। এলডিসি উত্তরণ এখনো সম্পন্ন করেনি এমন কোনো দেশের সঙ্গে ইইউর পক্ষ থেকে এ ধরনের এফটিএ প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনা এটিই ইতিহাসে প্রথম ও অনন্য।

আরও পড়ুন: সাময়িক ঝড়েও মুছবে না ভারত-বাংলাদেশের দীর্ঘ বন্ধন

তবে সম্ভাব্য এই এফটিএ চুক্তির ক্ষেত্রে কিছু পূর্বশর্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর জোর দিয়েছেন ইইউ রাষ্ট্রদূত। তিনি ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে ইইউর বাণিজ্য চুক্তির উদাহরণ টেনে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করবে দেশের ভেতরে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, শ্রম অধিকার, মানবাধিকারের সুরক্ষা, কার্যকর পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সুশাসনের মানদণ্ডের ওপর। এগুলোকে কোনোভাবেই গৌণ ভাবার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগের জন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে মাইকেল মিলার বলেন, ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত ও সামাজিক রূপান্তরের মতো ধাক্কা সামলাতে হলে দেশের শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং অনুমানযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরি।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, দেশে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় কাজ শুরু হলেও তা এখনো সমাপ্তির পথে পৌঁছায়নি। এই মৌলিক সংস্কার প্রক্রিয়াকে সফলভাবে শেষ করতে এবং দেশকে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে রাজনৈতিক অঙ্গনে বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সাহায্য করার জন্য ইইউর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলোর কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত জানান, ইউরোপীয় মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক বিনিয়োগের মেলবন্ধন ঘটিয়ে উন্নত প্রযুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি মূলধন, মানদণ্ড এবং উদ্ভাবন বাংলাদেশে নিয়ে আসতে চায় ইইউ। 

চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল উন্নয়ন প্রকল্প এবং গ্রিন বন্ড চালুর মতো উদ্যোগগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের একনায়কতন্ত্র থেকে সফল গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্বমূলকভাবে বিনিময় করতে প্রস্তুত ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

সবশেষে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ যেন একটি উন্মুক্ত, সার্বভৌম, স্থিতিস্থাপক, সহনশীল ও সুসংযুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, সে লক্ষ্যেই ইইউর এই অংশীদারত্ব ও সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়