নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৩:৩৮, ৪ অক্টোবর ২০২৬

সেপ্টেম্বরে সড়কে ঝরল ৪২৩ প্রাণ

সেপ্টেম্বরে সড়কে ঝরল ৪২৩ প্রাণ

ফাইল ছবি

দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির মিছিল কোনোভাবেই থামছে না। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক মাসিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক আতঙ্কজনক চিত্র। সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেশি। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেপরোয়া গতি, ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামো এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এই বিশদ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

হতাহতদের ডেমোগ্রাফি ও শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৭৩ জন নারী এবং ৬১টি শিশু রয়েছে। এককভাবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। এ মাসে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩২.৮৬ শতাংশ (হারের দিক থেকে ৩৪.৮৪%)। এছাড়া দুর্ঘটনায় ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৫.৫ শতাংশ। যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের এই হার দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। পাশাপাশি, যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন, যা মোট নিহতের ১২.৫২ শতাংশ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নিহতদের পেশাগত পরিচয়ে এক মর্মান্তিক বৈচিত্র্য ও জাতীয় ক্ষতি লক্ষ্য করা যায়। 

পেশাজীবীদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৮ জন শিক্ষার্থী, ২৪ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ১৮ জন এনজিও কর্মী, ১৩ জন শিক্ষক, ৩ জন সাংবাদিক, ২ জন চিকিৎসক, ৪ জন প্রকৌশলী, ১ জন কাস্টমস কর্মকর্তা, ১১ জন ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা-কর্মচারী, ১ জন বিদেশি নাগরিক, ২ জন পুলিশ সদস্য, ১ জন সেনা সদস্য, ২৫ জন ব্যবসায়ী, ২১ জন বিক্রয় প্রতিনিধি, ১৪ জন দিনমজুর, ৬ জন পোশাক শ্রমিক, ৪ জন মোটর মেকানিক, ৩ জন মসজিদের ইমাম বা খাদেম এবং ১ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।

সেপ্টেম্বর মাসে সংঘটিত মোট ৬৯১টি যানবাহনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে এসব দুর্ঘটনায়। এর মধ্যে ১৬২টি মোটরসাইকেল, ১২৯টি থ্রি-হুইলার, ১১৩টি বাস, ৯৩টি ট্রাক, ৪৬টি অজ্ঞাত যানবাহন, ৩২টি স্থানীয়ভাবে তৈরি যান, ২৯টি কাভার্ডভ্যান, ১৭টি পিকআপ, ১৫টি প্রাইভেটকার, ১২টি মাইক্রোবাস, ৮টি অ্যাম্বুলেন্স, ৮টি বাইসাইকেল, ৭টি লরি, ৬টি ট্রলি, ৫টি জিপ, ৪টি ট্রাক্টর, ৩টি ড্রাম ট্রাক এবং ২টি সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী ট্রাক অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সবচেয়ে বেশি ১৬৮টি (৩৮%) দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১০৯টি (২৪.৬৬%), মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ৯৮টি (২২.১৭%), পেছনের দিক থেকে আঘাত করার ঘটনা ঘটেছে ৬১টি (১৩.৮০%) এবং অন্যান্য কারণে ঘটেছে ৬টি দুর্ঘটনা। 

সড়কের ধরন অনুযায়ী বিন্যাস করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে ১৭৮টি (৪০.২৭%)। এ ছাড়া জাতীয় মহাসড়কে ১৪৫টি, শহরের সড়কে ৬৩টি এবং গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি দুর্ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোরের দিকে ৮.১৪%, সকালে ২৪.৪৩%, দুপুরে ২১.২৬%, বিকেলে ১৭.৪২%, সন্ধ্যায় ১১.৭৬% এবং রাতের বেলায় ১৬.৯৬% দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

দেশজুড়ে সংঘটিত এসব দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগ। 

অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট দুর্ঘটনার ২৯.৮৬% এবং প্রাণহানির ৩১.৬৭%। একক জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৩৮ জন নিহত হয়েছেন গাজীপুরে এবং রাজধানী ঢাকায় ৫২টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন। 

আরও পড়ুন: অগাস্টে সড়কে নিহত ৪৮১, আহত ৬৬৪: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭.৮৭% দুর্ঘটনা ও ১৭.৭৩% প্রাণহানি, খুলনা বিভাগে ১৭.৪২% দুর্ঘটনা ও ১৪.৪২% প্রাণহানি, রাজশাহী বিভাগে ১২% দুর্ঘটনা ও ১০.৮৭% প্রাণহানি, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭.২৩% দুর্ঘটনা ও ৭.৮০% প্রাণহানি, বরিশাল বিভাগে ৫.২০% দুর্ঘটনা ও ৬.৬১% প্রাণহানি এবং রংপুর বিভাগে ৫.৬৫% দুর্ঘটনা ও ৫.৯১% প্রাণহানি ঘটেছে। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রেকর্ড করা হয়েছে সিলেট বিভাগে, যেখানে ২০টি দুর্ঘটনায় মাত্র ২১ জন (৪.৯৬%) নিহত হন।

কেবল সড়ক পথেই নয়, সেপ্টেম্বর মাসে দেশের নৌ ও রেলপথের নিরাপত্তাও ছিল চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এই এক মাসে দেশজুড়ে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ৭ জন আহত এবং ৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন। পাশাপাশি, ২৩টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ৬ জন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং শৃঙ্খলার অভাবই এসব দুর্ঘটনার প্রধান অনুঘটক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী চিহ্নিত মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও বেহাল সড়ক অবকাঠামো, যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, চালকদের অদক্ষতা, শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা এবং নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও নির্ধারিত বেতন না থাকা। 

এ ছাড়া মহাসড়কে ধীরগতির থ্রি-হুইলার বা স্থানীয় যানের অবাধ চলাচল, তরুণ সমাজ কর্তৃক বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালনা, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

মর্মান্তিক এসব প্রাণহানি রোধ এবং টেকসই নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে সংগঠনটি। এর মধ্যে রয়েছে অবিলম্বে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন এবং বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএ-এর কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার করা। মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, প্রযুক্তির সাহায্যে মহাসড়কে গতির ওপর কঠোর নজরদারি রাখা এবং রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করা। দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়ানো এবং তাদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সন্তোষজনক বেতন ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা। মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের চলাচলের জন্য অবিলম্বে পৃথক সার্ভিস রোড নির্মাণ করা এবং দেশের সব অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার বা পাহাদার নিয়োগ করা। সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবনমুখী প্রচারণা চালানো। 

সর্বোপরি, সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন খাতকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক নীতিমালা, উন্নত প্রযুক্তি, মজবুত অবকাঠামো এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতার পাশাপাশি সরকারের শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছাই কেবল সড়কে ঝরতে থাকা তাজা প্রাণগুলো রক্ষা করতে পারে বলে মনে করে সংগঠনটি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়