একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে আইনমন্ত্রীর দাবি
ছবি: সংগৃহীত
সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও অবস্থান সঠিক ছিল না এমন অবস্থান দলটি পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি জানান, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধনের সময় সংসদে দলটির পক্ষ থেকে কোনো না ভোট না দেওয়ার মাধ্যমেই এই ঐতিহাসিক সত্য ও বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মরহুম ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের লেখা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী : এর ইতিহাস ও রাজনীতি শীর্ষক স্মৃতিকথামূলক বইয়ের প্রকাশনা ও মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) কর্তৃক প্রকাশিত এই গ্রন্থটিতে জামায়াতের সঙ্গে লেখক দীর্ঘ ৩৩ বছরের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রচেষ্টা এবং একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
অনুষ্ঠানে বইটির মূল্যায়ন করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতের পক্ষ থেকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার যে রাজনৈতিক প্রস্তাব বা স্টেটমেন্ট তৈরি করেছিলেন, দলীয় নেতৃত্ব তখন তা গ্রহণ করলে অনেক জটিল প্রশ্নেরই সুরাহা হয়ে যেত।
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ও সংসদীয় কার্যধারায় জামায়াত যেভাবে অবস্থান নিয়েছে, তা থেকে প্রতীয়মান হয় যে তারা একাত্তরের ভুল বা নেতিবাচক ভূমিকা কার্যত মেনে নিয়েছে।
আরও পড়ুন: সাইবার আইনে বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তির মর্যাদা দুটিই বিবেচনায়: আইনমন্ত্রী
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধনের প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেন, গত ২০২৬ সালের সংসদীয় অধিবেশনে আইন পাসের প্রক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায় স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয় যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, রাজাকার, আল-বদরের পাশাপাশি তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামী পার্টির বিরোধিতা ও সংগ্রাম করা ব্যক্তিরাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। ওই সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে দলটির নাম সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তোলা হলেও ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে তৎকালীন শব্দ যুক্ত করা হয় এবং সংসদে আইনটি পাসের সময় জামায়াতে ইসলামীর কোনো সংসদ সদস্য বা সদস্যপক্ষ এতে কোনো না ভোট প্রদান করেননি।
আইনমন্ত্রীর মতে, পার্লামেন্টারি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে এবং না ভোট না দেওয়ার মধ্য দিয়েই জামায়াত পরোক্ষভাবে একাত্তরের সেই ঐতিহাসিক অবস্থান মেনে নিয়েছে।
আইন অঙ্গনে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের অবদান ও প্রাসঙ্গিকতা স্মরণ করে আইনমন্ত্রী বলেন, রাজ্জাক সাহেবের এই বইটি কোনো গতানুগতিক সাহিত্য বা কেবল গবেষণাধর্মী রচনা নয়, বরং এটি একজন জীবন্ত মানুষের জীবনদর্শন ও এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো প্রামাণ্য দলিল। ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের প্রচলিত ধারণার সাথে লেখকের চিন্তার ভিন্নতা থাকতে পারে, তবে মূল্যবোধের জায়গা থেকে বইটি আইনবিদ ও গবেষকদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। এ সময় বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর মূলধারার শীর্ষস্থানীয় ও পরিচিত আইনজীবীদের অনুপস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে মন্ত্রী একে দলটির নেতৃত্বেরই দীনতা, ব্যর্থতা, সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা বলে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হয় এবং বইটিতে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সমালোচনা থাকলেও তা উম্মুক্ত মনে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্ট বক্তাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী।
তিনি তার বক্তব্যে বলেন, দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে কাঠামোগত ও আদর্শগতভাবে এখনো অনেক রিফর্মেশন বা সংস্কার সাধনের ব্যাপক অবকাশ ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, গবেষক, আইন বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই প্রকাশনা অনুষ্ঠানটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








