১৪ বছর পর এভারেস্টের চূড়ায় তৃতীয় বাংলাদেশি নারী নিম্নি
এভারেস্ট জয় করলেন পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি। ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৪ বছরের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করলেন বাংলাদেশের পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি। প্রথম বাংলাদেশি নারী নিশাত মজুমদার ও দ্বিতীয় নারী ওয়াসফিয়া নাজরীনের পর তৃতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে এই গৌরব অর্জন করলেন তিনি। একই সাথে বাংলাদেশের পর্বতারোহণের ইতিহাসে তিনি অষ্টম এভারেস্টবিজয়ী। ২০২৬ সালের মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র অভিযাত্রী হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান এবং পরম গৌরবে হিমালয়ের চূড়ায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান।
অভিযান ব্যবস্থাপনা সংস্থা ‘এইটকে এক্সপেডিশন’ (8K Expedition)-এর বরাতে বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি) এই ঐতিহাসিক খবরটি নিশ্চিত করেছে।
নেপালের স্থানীয় সময় (বুধবার) ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে মাউন্ট এভারেস্টের শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেন নিম্নি। তার এই চূড়ান্ত আরোহণের পথটি ছিল অত্যন্ত বৈরী এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় পূর্ণ।
গত ১৭ মে চূড়ান্ত অভিযানের উদ্দেশ্যে এভারেস্ট বেজক্যাম্প ত্যাগ করার পর ধাপে ধাপে ২৩ মে তিনি ক্যাম্প-৪-এ (৭,৯০০ মিটার) পৌঁছান। তবে তীব্র প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখে পড়ে সেবার চূড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেও তিনি নিচে নেমে আসতে বাধ্য হন এবং অনুকূল আবহাওয়ার অপেক্ষায় কয়েকদিন ক্যাম্প-২-এ (৬,৪০০ মিটার) অবস্থান করেন। পরবর্তীতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুকূলে এলে ২৫ মে তিনি পুনরায় সামিট পুশ শুরু করেন এবং ২৬ মে ভোরে ক্যাম্প-৩ (৭,২০০ মিটার) হয়ে দুপুর আড়াইটা নাগাদ পুনরায় ক্যাম্প-৪-এ পৌঁছান। সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নেওয়ার পর শুরু হয় চূড়ার উদ্দেশ্যে তাঁর চূড়ান্ত ও রুদ্ধশ্বাস আরোহণ। নেপালের অভিজ্ঞ শেরপা দাওয়া নুপু, লাকপা থিনদুক এবং এইটকে এক্সপেডিশনের অ্যাঙ তেম্বা শেরপার আনুষ্ঠানিক তত্ত্বাবধানে সারারাত দুর্গম বরফপথ পাড়ি দিয়ে আজ ভোরে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে পা রাখেন।
আরও পড়ুন: দেশবাসীকে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানালেন প্রধানমন্ত্রী
রংপুরে বেড়ে ওঠা নুরুন্নাহার নিম্নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক ‘পূবালী ব্যাংক পিএলসি’ এর জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। একজন পেশাদার ব্যাংকার হওয়া সত্ত্বেও পাহাড়ের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ ও ভালোবাসা থেকেই তার এই রোমাঞ্চকর পর্বতারোহণের যাত্রা শুরু হয়েছিল। নিম্নির এই স্বপ্নের ও ঐতিহাসিক এভারেস্ট অভিযানের মূল পরিকল্পনা করেছিল বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব এবং সম্পূর্ণ অভিযানের পৃষ্ঠপোষকতা বা স্পনসর করেছে তার কর্মস্থল পূবালী ব্যাংক পিএলসি।
নিম্নি হঠাৎ করেই এভারেস্ট অভিযানে যাননি, বরং এর পেছনে রয়েছে দুই দশকের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পাহাড়ের সাথে নিবিড় সখ্যতা। ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে অধ্যয়নকালীন সময়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে প্রাতিষ্ঠানিক ফিল্ডওয়ার্কে গিয়ে পাহাড়ের প্রতি প্রথম আকর্ষণ তৈরি হয় তার। এরপর তিনি বাংলাদেশের বান্দরবানের বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ে ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকেন। পরবর্তীতে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ভুটান, ভারতের সিকিম এবং নেপালের বিভিন্ন পর্বতমালায় ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা তাকে আরও বড় পর্বত জয়ে অনুপ্রাণিত করে। ২০১৯ সালে নেপালের অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্প ভ্রমণের পর তিনি আরও উঁচুতে ওঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এবং ২০২০ সালে এভারেস্ট বেজক্যাম্প (EBC) সফলভাবে ট্রেক করার পর পেশাদার পর্বতারোহণে যুক্ত হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। নিজেকে আন্তর্জাতিক মানের পর্বতারোহী হিসেবে গড়ে তুলতে ২০২২ সালে ভারতের দার্জিলিংয়ে অবস্থিত বিখ্যাত ‘হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট’ (HMI) থেকে উচ্চতর পেশাদার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং একই বছর তিনি দেশের প্রাচীন পর্বতারোহণ সংগঠন বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সাথে যুক্ত হন।
নুরুন্নাহার নিম্নির এই অভাবনীয় সাফল্য বাংলাদেশের পর্বতারোহণের ইতিহাসে এক নতুন ও গৌরবময় অধ্যায় যোগ করল। এর আগে ২০১০ সালের ২৩ মে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন মুসা ইব্রাহীম। এরপর এম এ মুহিত দুইবার বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেন। ২০১২ সালের ১৯ মে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে নিশাত মজুমদার এবং একই বছরের ২৬ মে ওয়াসেফিয়া নাজরীন এভারেস্ট জয় করেছিলেন। ২০১৩ সালে সজল খালেদ এভারেস্ট জয় করলেও দুর্ভাগ্যবশত শিখর থেকে নামার পথে মারা যান। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালে বাবর আলী এবং ২০২৫ সালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে পায়ে হেঁটে এভারেস্ট চূড়ায় উঠে ইতিহাস গড়েন ইকরামুল হাসান শাকিল। সর্বশেষ ২০২৬ সালের এই মে মাসে পূর্বসূরিদের সেই গৌরবময় পথ অনুসরণ করে এবং দীর্ঘ ১৪ বছরের নারী পর্বতারোহীদের খরা কাটিয়ে দেশের একমাত্র অভিযাত্রী হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় লাল-সবুজের পতাকা ওড়ালেন নুরুন্নাহার নিম্নি। তার এই অনন্য কৃতিত্বে দেশের ক্রীড়া ও পর্বতারোহণ অঙ্গনে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








