গ্যাসের সমস্যায় ১২ ঘণ্টা অন্ধকারে দেশ
ছবি: নিউজবাংলাদেশ (এআই)
গ্যাস সরবরাহে ধস নামার ফলে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা দেশ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে চলছে নজিরবিহীন লোডশেডিং। কোথাও কোথাও গ্রাহকদের প্রতিদিন ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। আকস্মিক এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়া, জ্বালানি খাতের বকেয়া সংকট এবং কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এই বহুমুখী সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ ১৭ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল) ও পেট্রোবাংলার সূত্র জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) বা এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের মাধ্যমে চালুর একাধিক সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আগামী ১০ আগস্টের পর ক্ষতিগ্রস্ত এই টার্মিনালের মাত্র অর্ধেক অংশ পুনরায় চালু করা সম্ভব হতে পারে, তবে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহকৃত ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস কমে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং পিডিবি সূত্রে জানা যায়, গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক সময়ে উৎপাদিত ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে বর্তমানে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটে ঠেকেছে। পিজিসিবির তালিকাভুক্ত ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬২টি বর্তমানে জ্বালানি সংকটে ভুগছে, যার মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তরল জ্বালানিভিত্তিক এবং দুটি কয়লাভিত্তিক।
গত ৩ আগস্ট সোমবার দিবাগত রাত ১২টায় সারা দেশে ৩ হাজার ২৩২ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়, যা সোম ও মঙ্গলবারের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, সরকারি এই হিসাবের বাইরেও কাগুজে পরিসংখ্যানের আড়ালে প্রকৃত লোডশেডিং আরও ভয়াবহ। গত সপ্তাহে দৈনিক গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি ১ হাজার ৪৮২ মেগাওয়াটে দাঁড়ালেও চলতি সপ্তাহের বিভিন্ন সময়ে এই ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
উৎপাদন ঘাটতি মেটাতে গিয়ে পিডিবিকে ফার্নেস অয়েল এবং এমনকি উচ্চ ব্যয়ের কারণে সাধারণত অব্যবহৃত রাখা সৈয়দপুর ও খুলনার ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও সচল রাখতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পায়রা, রামপাল, এসএস পাওয়ার ও পটুয়াখালীসহ প্রধান কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো কয়লার স্বল্পতা ও রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় ৭ টাকা ৭১ পয়সায় উন্নীত হয়েছে, যা সাধারণ সময়ে ৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
আরও পড়ুন: গ্যাস সংকটে পোশাকশিল্পে অশনিসংকেত
শহরের তুলনায় গ্রামীণ জনপদ ও মফস্বলে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ময়মনসিংহ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর ও জামালপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার ও ডিজিএমদের তথ্য অনুযায়ী, তারা চাহিদার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ কম পাচ্ছেন।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. আকমল হোসেন জানান, গ্রাহকদের প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন কাটাতে হচ্ছে।
পাবনার দাশুড়িয়ার ডিজিএম প্রকৌশলী রথীন্দ্র নাথ বর্মণ ও সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানান, চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় তাদের নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহের ফুলপুরের চালকল মালিক জসিম উদ্দিন ও কুমিল্লার মাছচাষি রহমত উল্লাহ জানান, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের ব্যবসা, সেচ কার্যক্রম এবং কলকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে শ্রমিকদের অলস সময় কাটাতে হচ্ছে এবং অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। বিপরীতে রাজধানী ঢাকায় লোডশেডিং নামমাত্র হলেও বিতরণ এলাকা বড় হওয়ায় সংক্ষিপ্ত বিরতিতে পালাক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত রাখা হচ্ছে। খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের ২১ জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ওজোপাডিকোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ঘাটতি ও লোডশেডিংয়ের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি গ্যাস সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়েছে পরিবহন খাতের ওপর। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনের বাইরে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
সিএনজি চালক মো. হাজেম, রংপুরের এমদাদ ও জামালপুরের আব্দুর রহিমের ভাষ্যমতে, একবার গ্যাসের লাইনে দাঁড়ালে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় নষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন দুই দফায় গ্যাস নিতে চার ঘণ্টা ব্যয় হওয়ায় চালকদের দৈনিক আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং সংসার চালানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও গ্যাস নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায় করারও অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘস্থায়ী এই বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের ফলে গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি দেশের শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্প, কুটির শিল্প, চালকল, কোল্ড স্টোরেজ এবং ছোট দোকানপাটগুলো উৎপাদন সময় ও মুনাফা হারাচ্ছে। ইতোমধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া বিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোয় এবং নতুন করে তরল জ্বালানি ও কয়লার জোগান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আর্থিক জটিলতা থাকায় চাইলেই তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে না। সব মিলিয়ে জ্বালানি খাতের এই নজিরবিহীন সংকট নিরসনে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবন আরও গভীর স্থবিরতার দিকে ধাবিত হতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








