নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:৪২, ৫ আগস্ট ২০২৬

‘আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আদালত’

‘আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আদালত’

ছবি: সংগৃহীত

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আদালতের রায়ের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। 

তিনি বলেছেন, নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে সরকার নয়; তবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো দল গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ী, তাহলে আদালতই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন। একই সঙ্গে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, গণহত্যাকারী বা ফ্যাসিবাদী কোনো শক্তিকে বাংলাদেশের মাটিতে আর রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

বুধবার (০৫ আগস্ট) জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র, ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন অনুষ্ঠান এবং শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভাসহ পৃথক কর্মসূচিতে দেওয়া ধারাবাহিক বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই-আগস্টের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। তদন্ত সম্পন্ন হলে ব্যক্তি অভিযুক্তদের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবেও আওয়ামী লীগকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলেও তিনি জানান। 

তার ভাষায়, ব্যক্তির মতো সংগঠনও যদি গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকে, তাহলে সেই সংগঠনেরও বিচার হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিষয়ে সরকারের অবস্থান প্রতিশোধের নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার। তাই নির্বাহী আদেশে কোনো দলকে নিষিদ্ধ নয়, বরং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাদের রাজনৈতিক পরিণতি নির্ধারণ করা হবে। আদালতের রায়ই হবে চূড়ান্ত।

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের ৩৬ দিনের আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল ২০০৯ সাল থেকে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরিণতি। ছাত্রদল, যুবদল, বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল, ছাত্র-জনতা এবং অসংখ্য গণতন্ত্রকামী মানুষের ধারাবাহিক আত্মত্যাগ, কারাবরণ, গুম-খুন ও নির্যাতনের মধ্য দিয়েই জুলাই অভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। সেই দীর্ঘ আন্দোলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অবদানও উল্লেখযোগ্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো স্বৈরাচারের পতন একদিনে হয় না। জুলাইয়ের ৩৬ দিন ছিল বহু বছরের সংগ্রামের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। তাই এই বিজয় কোনো ব্যক্তি, দল বা সংগঠনের একার নয়; এটি সমগ্র জাতির অর্জন।

রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি এখন প্রশ্ন তুলি জুলাই কার, তাহলে জুলাই কারও থাকবে না। জুলাইকে দলীয় সম্পদে পরিণত করার চেষ্টা করলে এর চেতনা নষ্ট হবে। 

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে গিয়ে একসময় মানুষকে তা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জুলাইয়ের ক্ষেত্রেও একই ভুল করা যাবে না। জুলাইয়ের চেতনা হবে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি, বিভাজনের হাতিয়ার নয়।

তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ে শহীদ হওয়া মানুষরাই প্রকৃত জুলাই যোদ্ধা ও প্রকৃত নেতা। যারা জীবন দিয়ে এই আন্দোলনকে সফল করেছেন, তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই এখন রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রধান দায়িত্ব। জুলাইয়ের কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, বরং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত।

সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য পূরণে কেবল রাজনৈতিক আলোচনা যথেষ্ট নয়; সাংবিধানিক পরিবর্তনও অপরিহার্য। সে লক্ষ্যেই সংবিধানের প্রস্তাবিত অষ্টাদশ সংশোধনী আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এ লক্ষ্যে প্রধান বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তিকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দিয়ে মতামত দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। 

আরও পড়ুন: বিশৃঙ্খলা করলে আ.লীগকে রাজপথেই প্রতিহত করা হবে

তার ভাষায়, সংস্কার কমিশন, জাতীয় সংস্কার পরিষদ বা অন্য যে নামই দেওয়া হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত বাস্তব পরিবর্তন আনতে হলে সংসদে সাংবিধানিক সংশোধনীই পাস করতে হবে। বিশেষজ্ঞ, সংবিধানবিদ, সম্পাদক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়েই দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর সংস্কার আনা হবে।

গণভোট, গণরায় এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণআকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই তা করতে হবে। এজন্য সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

বিগত সরকারের সময়ে গুম, খুন এবং কথিত আয়নাঘর-এর প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। 

তিনি বলেন, তিনি নিজে ৬১ দিন আয়নাঘরে বন্দি ছিলেন এবং জানেন সেই নির্যাতনের ভয়াবহতা। সেখানে ২৪ ঘণ্টাও থাকা কঠিন, অথচ অনেকেই মাসের পর মাস সেখানে কাটিয়েছেন। ইলিয়াস আলীসহ অসংখ্য গুমের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের সময় যারা গুরুতর আহত হয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনে সরকার নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। চিকিৎসাধীন আহতদের দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। যারা চিকিৎসার পর কর্মক্ষম হয়ে উঠবেন, তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হবে। আর যারা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, তাদের সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে যারা এখনো তালিকাভুক্ত হননি, তাদেরও দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান, গণহত্যার বিচার এবং গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নে সবাইকে এক কাতারে থাকতে হবে। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আর কোনোদিন ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান হতে দেওয়া হবে না।

বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল বহু বছরের সংগ্রামের অর্জন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতির যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বর্তমান প্রজন্ম ইতিহাসের কাছে দায়ী থাকবে। তাই জুলাইকে রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র সংস্কার, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মাধ্যমে এর চেতনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়