নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:০৪, ৫ আগস্ট ২০২৬

‘বিশৃঙ্খলা করলে আ.লীগকে রাজপথেই প্রতিহত করা হবে’

‘বিশৃঙ্খলা করলে আ.লীগকে রাজপথেই প্রতিহত করা হবে’

ছবি: সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীর যোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করাকে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান এবং পবিত্র দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। 

একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের শাসনামলে গুম, খুন, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পরও আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। দলটি যদি আবারও দেশে অস্থিতিশীলতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে, তবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথেই তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

বুধবার (০৫ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা, জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। একই দিনে দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া পৃথক বাণীতেও তিনি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও ইনসাফভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সংবর্ধনা নিতে আসা শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া জুলাই যোদ্ধারা নিজেদের ত্যাগ, সংগ্রাম ও অপূর্ণতার কথা বলতে গিয়ে অনেকেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।

তাদের উদ্দেশে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, জুলাইয়ের ইতিহাস জাতির গৌরবের ইতিহাস। এই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র সংস্কারের এক ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং সেই আন্দোলনের যোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়।

তিনি বলেন, সীমিত সম্পদের দেশ হলেও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণে যা কিছু করা সম্ভব, সরকার তা করবে। তাদের যদি প্রাপ্য অধিকার ও সম্মান আদায়ের জন্য মন্ত্রণালয় কিংবা নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তাহলে সেটি শুধু সরকারের নয়, পুরো জাতির জন্যই লজ্জাজনক হবে। সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে জুলাই যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, খুন, গুম, নির্যাতন এবং কথিত আয়নাঘর-এর মতো ঘটনাগুলোর পরও দলটির নেতাদের মধ্যে ন্যূনতম অনুশোচনা নেই। বরং তারা এখনো বিভিন্নভাবে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগের নেতারা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা বলছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বলছে ডিসেম্বরে দেশে আসবে। আসেন, আমরাও দেখবো। 

এরপরই তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, তারা যদি আবারও জল ঘোলা করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দুঃসাহস দেখায়, তবে দেশের আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথেই তাদের মোকাবিলা করা হবে। আওয়ামী লীগ এলে আবারও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হবে, দেখা হবে রাজপথে-বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্মিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিষয়ক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের সময় অসন্তোষ ও হট্টগোলের ঘটনাও ঘটে। উপস্থিত অনেকেই অভিযোগ করেন, আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত শহীদ আবু সাঈদ এবং আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আলোচিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেখানে যথাযথভাবে স্থান পায়নি। 

আরও পড়ুন: জুলাই স্মৃতি জাদুঘর আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে: প্রধানমন্ত্রী

এ প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতীয় অনুষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জার। পরে আয়োজকদের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হলেও তিনি মনে করেন, ঐতিহাসিক একটি গণআন্দোলনের প্রামাণ্যচিত্রে এমন অসঙ্গতি থাকা উচিত হয়নি।

বিশেষ করে শহীদ আবু সাঈদের ছবি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ফুটেজ না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইতিহাসকে বিকৃত বা অসম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত চিত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

অনুষ্ঠানে উপস্থিতদের আচরণ নিয়েও মন্তব্য করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, কেউ বক্তব্য দিতে উঠলে ভুয়া, ভুয়া বলে বাধা দেওয়া কোনো সভ্য সংস্কৃতি হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সবাইকে সম্মান দেখানো উচিত। মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু বিশৃঙ্খলা কখনো কাম্য নয়।

তিনি বলেন, আমরা সবাইকে সম্মান করতে চাই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল একটি নিরাপদ, অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। জনগণের জন্য গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ী করে যাওয়াই সরকারের অঙ্গীকার। জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ দেশবাসীকে চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই সেই আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা দেওয়া সম্ভব হবে।

এদিকে দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া পৃথক বাণীতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে এবং গণরোষের মুখে তৎকালীন সরকার দেশত্যাগে বাধ্য হয়। তিনি এই ঐতিহাসিক অর্জনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে সব জুলাই যোদ্ধা ও দেশপ্রেমিক নাগরিককে শুভেচ্ছা জানান।

বাণীতে তিনি শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, ফারহান, নাফিজ, তাইম, নাঈমা, শিশু রিয়া গোপ, আহাদসহ আন্দোলনে আত্মোৎসর্গকারী সকল শহীদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী যোদ্ধাদের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা জানান। 

তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসন, বৈষম্য, দুর্নীতি, শোষণ, গুম-খুন, ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।

তিনি আরও বলেন, জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত উৎস জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই চিরন্তন সত্য আবারও প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাই শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার, উগ্রপন্থা, বৈষম্য ও দুর্নীতির কোনো স্থান থাকবে না; নিশ্চিত হবে সুশাসন, জবাবদিহি ও আইনের শাসন।

বাণীর শেষাংশে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি জুলাই শহীদ পরিবারের কল্যাণ, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি তিনি দেশের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন এবং আন্দোলনে আত্মোৎসর্গকারী সকল শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়