আদালত চত্বরে এনসিপির বহিষ্কৃত নেতা তানভীরকে ডিম নিক্ষেপ
ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর ও মানহানিকর মন্তব্য করার অভিযোগে দায়ের করা সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব পদ থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি পাওয়া গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে বগুড়া জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (০৫ আগস্ট) দুপুরে বগুড়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে তাকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে এনসিপির একটি পথসভাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনার জেরে গত ২৯ জুলাই গাজী সালাউদ্দিন তানভীরের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে একটি মানহানিকর ও উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়া হয়।
পোস্টটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরবর্তীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার মুখে তানভীর তার ফেসবুক আইডি থেকে পোস্টটি মুছে ফেলেন এবং প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করার চেষ্টা করেন।
তবে এই ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হলে বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফতুন আহমেদ খান রুবেল বাদী হয়ে গত ২ আগস্ট বগুড়া সদর থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয় যে, ওই উসকানিমূলক পোস্টের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির মানহানি করা হয়েছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। মামলা দায়েরের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেফতারে তৎপরতা শুরু করে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার ভোরে রাজধানীর মিরপুরের পূর্ব মনিপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসা ও আবাসিক ভবনে যৌথ অভিযান চালায় বগুড়া জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অভিযানে সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলার এজাহারভুক্ত আসামি গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে দ্রুত বগুড়ায় নিয়ে আসা হয় এবং বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর আমলি আদালতের বিচারক মেহেদী হাসানের আদালতে হাজির করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আসামির বিরুদ্ধে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হলে, আদালত শুনানি শেষে রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করে তানভীরকে বগুড়া জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন: গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ, ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ১
এদিকে তানভীরকে আদালতে তোলার খবর ছড়িয়ে পড়লে সকাল থেকেই বগুড়া আদালত চত্বরে অবস্থান নেন জেলা ছাত্রদল, নগর শাখা এবং সরকারি আজিজুল হক কলেজ ও সরকারি শাহ সুলতান কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। সরকারি আজিজুল হক কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাফিউল আল আমিন ও জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সন্ধান সরকারের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা আদালত চত্বরে নানা ধরনের স্লোগান দেন। পরবর্তীতে পুলিশি প্রহরায় তানভীরকে আদালত ভবন থেকে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় বিক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ করেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং তানভীরকে নিয়ে প্রিজন ভ্যানটি কারাগারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
ঘটনার বিষয়ে বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সন্ধান সরকার এবং আজিজুল হক কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাফিউল আল আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও বগুড়ার কৃতি সন্তান তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে গাজী সালাউদ্দিন তানভীর দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। দেশের জনগণ এবং ছাত্রসমাজ এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ মেনে নেবে না। আমরা আসামির দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।
অন্যদিকে বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ইনচার্জ ইকবাল বাহার ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী জানান, আসামিকে গ্রেফতারের পর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
আদালত চত্বরে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ে ডিবি ওসি ইকবাল বাহার বলেন, এটি মূলত নেতাকর্মীদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেয়নি। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা উদঘাটনের জন্য আদালতে রিমান্ড আবেদন কার্যকর করা হবে।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বিতর্কিত ও অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার ঘটনাটি দলের শৃঙ্খলা ও নীতিমালার চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে গত ১ আগস্ট এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব পদ থেকে গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে তার সন্তোষজনক জবাব না মেলায় এবং দলীয় ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ায় তাকে দল থেকে চূড়ান্তভাবে অব্যাহতি প্রদান করা হয়।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা রয়েছে যে, এটি এনসিপি থেকে গাজী সালাউদ্দিন তানভীরের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফার কোনো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা। এর আগে গত ২০২৫ সালের এপ্রিলে সচিবালয়ে অননুমোদিত প্রবেশ করে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে তদবির ও হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পাঠ্যবই ছাপার কাজে কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। সে সময়ও তাকে দল থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ তদন্তে অভিযোগ সরাসরি প্রমাণিত না হওয়ায় গত বছরের (২০২৬ সাল) ১৬ এপ্রিল তাকে পুনরায় দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুনর্বহাল হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে এই আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অপরাধে তিনি আবারও দলের রোষানলে পড়েন এবং আইনি জালে আটকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








