ইরানের ‘রেজিম চেঞ্জ’ ব্যর্থ, মোসাদের ২ কর্মকর্তা অপসারণ
ছবি: সংগৃহীত
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদলের খবর প্রকাশের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানে সরকার পরিবর্তনের একটি গোপন পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার জেরে সংস্থাটির দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল ১২।
যদিও ইসরায়েল সরকার কিংবা মোসাদ আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবু বিষয়টি ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া দুই কর্মকর্তার একজন ছিলেন মোসাদের ইরান বিভাগের প্রধান এবং অন্যজন গোয়েন্দা (ইন্টেলিজেন্স) অধিদপ্তরের প্রধান। তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি সরাসরি চাকরিচ্যুতি নয়; বরং তারা ভবিষ্যতেও মোসাদের অন্য দায়িত্বে যুক্ত থাকতে পারেন। গত ২ জুন মোসাদের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া রোমান গোফম্যান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। তবে সংস্থার অভ্যন্তরে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ ও বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে বলেও দাবি করেছে চ্যানেল ১২।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমটির দাবি, গত বছরের শেষ দিকে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকারের পতন ঘটানোর একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছিল মোসাদ। ওই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল সরকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে গোপন সমন্বয় গড়ে তুলে রাজনৈতিক অস্থিরতাকে সরকার পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য যৌথ সামরিক অভিযানের আড়ালে ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী শক্তিকে আরও সক্রিয় করার বিষয়ও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চ্যানেল ১২-এর তথ্যমতে, পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা যাচাই করা।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সম্ভাব্য সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামো, নতুন নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। এমনকি কুর্দি যোদ্ধাদের সম্পৃক্ত করে একটি স্থল-অভিযানের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়নি অথবা কার্যকর হওয়ার আগেই স্থগিত হয়ে যায়।
ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান মোসাদ পরিচালক রোমান গোফম্যান এর আগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সামরিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং ইরানে সরকার পরিবর্তনের কৌশলের অন্যতম সমর্থক ছিলেন।
পত্রিকাটির একাধিক সূত্রের দাবি, পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার দায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর না পড়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ওপর বর্তানোর উদ্দেশ্যেই তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এ দাবির স্বাধীন কোনো সরকারি সত্যতা পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে সরকারের ভূমিকা নেই: ভারত
এদিকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, তৎকালীন মোসাদ পরিচালক ডেভিড বার্নিয়া ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন যে, কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হতে পারে।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কুর্দি বাহিনীর নেতৃত্বে একটি স্থল অভিযান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা এবং ইরানের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী শক্তিকে সক্রিয় করার কৌশল বিবেচনায় ছিল।
একই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকেও সম্ভাব্য বিকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বিকল্প হিসেবে আলোচনা করা হয়েছিল। তবে এসব তথ্য কখনোই সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের সামরিক হামলার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রেখে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, তাদের আশঙ্কা যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান হরমুজ প্রণালি, পারস্য উপসাগর এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ককে কেন্দ্র করে কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
ইসরায়েল বহু বছর ধরেই অভিযোগ করে আসছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন, দূরপাল্লার ড্রোন সক্ষমতা এবং হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথি ও ইরাক-সিরিয়াভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
অন্যদিকে ইরান বরাবরই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোসাদের শীর্ষ পর্যায়ের এই রদবদল কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি ইরান নীতিতে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ কৌশলগত মতপার্থক্যেরও ইঙ্গিত বহন করতে পারে। বিশেষ করে গোফম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর ইরান-সংক্রান্ত অগ্রাধিকার, গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে সংস্থার ভেতরে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে।
তবে পুরো ঘটনাটির উল্লেখযোগ্য দিক হলো এখন পর্যন্ত মোসাদ, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মার্কিন প্রশাসন কিংবা ইরান সরকার কোনো পক্ষই চ্যানেল ১২, হারেৎজ বা অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবির সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। ফলে প্রকাশিত তথ্যগুলোর বড় অংশই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান, গোয়েন্দা সূত্র এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে। তাই এসব দাবির স্বাধীন ও সরকারি যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








