দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে সরকারের ভূমিকা নেই: ভারত
ফাইল ছবি
নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক অঙ্গনে যে আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তার মধ্যে নিজেদের অবস্থান আবারও স্পষ্ট করেছে ভারত সরকার।
দিল্লি জানিয়েছে, শেখ হাসিনার ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন, পরিচালনা কিংবা বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল না। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বর্তমান বৈধ ও সাংবিধানিকভাবে গঠিত সরকার সম্পর্কে শেখ হাসিনা যে মন্তব্য করেছেন, তার কোনো অংশকেই ভারত সরকার সমর্থন করে না।
শুক্রবার (০৭ আগস্ট) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকার এর আগেও অবস্থান জানিয়েছিল এবং সেই অবস্থানেই তারা অনড় রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংবাদ সম্মেলনটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না। ফলে ওই অনুষ্ঠানে প্রকাশিত মতামত বা বক্তব্যের দায়ও ভারত সরকারের নয়।
রণধীর জয়সওয়াল বলেন, আমরা আগেও বলেছি, আবারও বলছি এটি একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের আয়োজন ছিল। এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। ওই প্ল্যাটফর্মে যা কিছু বলা হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের যথাযথভাবে গঠিত সরকার সম্পর্কে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, ভারত সরকার তার কোনো অংশই সমর্থন করে না।
এই মন্তব্যের মাধ্যমে দিল্লি কার্যত বাংলাদেশের কূটনৈতিক আপত্তির জবাব দিলেও একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে যে, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির বক্তব্যকে ভারত সরকারের সরকারি অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
শেখ হাসিনা গত বুধবার নয়াদিল্লি থেকে একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান নেওয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন। ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (FCC South Asia) আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিজের বিরুদ্ধে চলমান বিচার, বর্তমান সরকার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দেন।
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, তার বিরুদ্ধে চলমান বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই তিনি দেশের মানুষের কাছে ফিরতে চান।
তিনি বলেন, আমার ভাগ্যে যা-ই থাকুক, আমি আমার মানুষের কাছে ফিরে যাব। আমার দেশবাসী যখন কষ্টে আছে, তখন আমি দূরে থাকতে পারি না। আমি ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরতে চাই।
তিনি আরও বলেন, গ্রেফতার, কারাবাস কিংবা জীবনের ঝুঁকি যে পরিস্থিতিই তৈরি হোক না কেন, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসবেন না।
শেখ হাসিনার এই বক্তব্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং কড়া প্রতিবাদ জানায়।
আরও পড়ুন: হাসিনার অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই: জয়সোয়াল
বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে ভারতের মাটিতে বসে পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি গুরুতর অসম্মান।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও দাবি করে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য অস্বীকার করে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের প্রচেষ্টা অতীতেও বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
ঢাকার বক্তব্য অনুযায়ী, সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই ভারত সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছিল, যাতে শেখ হাসিনা ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা বা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না পান। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকেও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এবং এমন কোনো আয়োজন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছিলেন।
তবে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ভারত সরকার আবারও জানিয়ে দেয়, এটি ছিল সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগ এবং সরকারের কোনো অনুমোদিত কর্মসূচি নয়।
এদিকে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকরা শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়েও ভারতের অবস্থান জানতে চান।
জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত তার প্রতিবেশী অঞ্চলের সব ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। বিশেষ করে যেসব বিষয় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো নিয়মিত মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ভারত তার নিকটতম প্রতিবেশী অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরও ভারত সরকার আগেই জানিয়েছিল, এর সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
গত ৪ আগস্ট একই বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, ৫ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার অংশগ্রহণ ভারত সরকারের কোনো কর্মসূচির অংশ নয় এবং এতে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। শুক্রবারের ব্রিফিংয়ে তিনি সেই অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়টিও আবার সামনে এনেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ২০১৩ সালের বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দিল্লিভিত্তিক সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হলেও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেছে, ওই অনুষ্ঠান কিংবা সেখানে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই এবং বাংলাদেশের বর্তমান বৈধ সরকার সম্পর্কে শেখ হাসিনার মন্তব্যের কোনো অংশই ভারত সমর্থন করে না।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








