আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:০১, ৭ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের নৌ-জোটের কমান্ডার নিয়োগ দিল সৌদি

বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের নৌ-জোটের কমান্ডার নিয়োগ দিল সৌদি

রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ বিন সালেম আল-শেহরি। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত সৌদি নেতৃত্বাধীন মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স (Multinational Maritime Defense Alliance)–এর প্রথম কমান্ডার হিসেবে রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ বিন সালেম আল-শেহরিকে নিয়োগ দিয়েছে সৌদি আরব। জোট গঠনের পর এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। 

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত এবং জ্বালানি সরবরাহের কৌশলগত রুট সুরক্ষিত রাখাই হবে তার নেতৃত্বাধীন জোটের প্রধান লক্ষ্য।

বৃহস্পতিবার (০৬ আগস্ট) সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, আল-শেহরি জোটের সামগ্রিক নৌ-প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। 

একই সঙ্গে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নৌবাহিনীর মধ্যে সমন্বয়, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগের সঙ্গে যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া ও সম্ভাব্য নৌ-অভিযানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বও তার ওপর ন্যস্ত থাকবে। আগামী ১২ ও ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য পরিকল্পনা বৈঠকে জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, কমান্ড ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রিয়ার অ্যাডমিরাল আল-শেহরির তিন দশকেরও বেশি প্রায় ৩২ বছরের সামরিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। রয়্যাল সৌদি নেভাল ফোর্সেসে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড, পরিকল্পনা ও অপারেশনাল দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে নৌবাহিনীর পরিকল্পনা, বাজেট ও বাহিনী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন, স্পেনে নেভাল সুপারভিশন অ্যান্ড ফলো-আপ অফিসের নেতৃত্ব এবং সারাওয়াত প্রকল্প-এর তদারকি উল্লেখযোগ্য। ওই প্রকল্পের আওতায় সৌদি নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করা হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বহুজাতিক সামরিক সমন্বয়, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থা এবং যৌথ নৌ-অভিযান পরিচালনায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে জোটের জন্য বড় সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কেবল সামরিক অভিজ্ঞতাই নয়, প্রতিরক্ষা কূটনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আল-শেহরি। তিনি সৌদি আরব ও স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সম্পাদিত নির্বাহী চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির সচিব ছিলেন। পাশাপাশি বহু আন্তর্জাতিক নৌ-মহড়া, যৌথ সামরিক অভিযান ও কৌশলগত পরিকল্পনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি স্পেনের মাদ্রিদের কমপ্লুতেন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিরক্ষা নীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুল থেকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরেকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে তার। যুক্তরাজ্যে উচ্চতর কৌশলগত নেতৃত্ব, স্পেনে কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ শিক্ষা এবং ফ্রান্সে উন্নত অপারেশনাল প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেছেন তিনি। দীর্ঘ সামরিক জীবনে অসংখ্য সামরিক পদক, ব্যাজ ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এই নৌ কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন: ন্যাটোর আদলে নতুন সামরিক জোট গড়ছে সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তান

গত ৩০ জুলাই রিয়াদে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক বৈঠকে এই জোট গঠনের উদ্যোগ আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। যদিও ৫১টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, বৈঠকে অংশ নেয় ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা। বৈঠক শেষে সৌদি আরব, বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কমোরোস এই ১৪টি দেশ যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে জোটের প্রতি সমর্থন জানায়।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, এটি একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জোট। অর্থাৎ, যেসব দেশ জোটের লক্ষ্য ও নীতিমালার সঙ্গে একমত, তারা নিজ নিজ জাতীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরবর্তীতে এতে যোগ দিতে পারবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ সদস্যপদ গ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

জোটের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাব আল-মান্দাব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর। ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই পথ দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বড় অংশ এবং বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবাহিত হয়। ফলে এসব জলপথে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জোটের কার্যপরিধির মধ্যে থাকবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়া, সমন্বিত নৌ টহল, প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ অভিযান এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি। তবে কোন দেশ কতটি যুদ্ধজাহাজ, টহল বিমান কিংবা অন্য সামরিক সম্পদ দেবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। 

সৌদি আরব স্পষ্ট করেছে, জোটটি আত্মরক্ষামূলক এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি।

তবে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় জোটটির গুরুত্ব নিয়ে বিশ্লেষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং সৌদি জাহাজের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। এর জবাবে সৌদি আরব হুথি নিয়ন্ত্রিত সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই এই নতুন নৌ-জোট গঠিত হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য হওয়া সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এখন পর্যন্ত এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যোগ দেয়নি। 

তবে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আগ্রহী সব দেশের জন্য সদস্যপদের দরজা খোলা থাকবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়